আন্তর্জাতিক বাজারের ৬০ শতাংশ দখল করতে পারে দেশীয় এয়ারলাইনগুলো: ইউএস-বাংলা এমডি
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Wednesday, March 25, 2026
ছবি: ওহিদুজ্জামান টিটু
বাংলাদেশের বেসামরিক
বিমান খাত দ্রুত বড় হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ছে যাত্রী ও আন্তর্জাতিক রুট। তবে কিছু
চ্যালেঞ্জ থাকার কারণে এই খাতের পুরো সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। মূল
চ্যালেঞ্জগুলো হলো দক্ষ জনবলের অভাব, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো
প্রতিষ্ঠান না থাকা এবং উন্নত রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধার ঘাটতি।
এভিয়েশন অ্যান্ড
ট্যুরিজম জার্নালিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশ (এটিজেএফবি)-এর প্রেসিডেন্ট মো. তানজিম
আনোয়ারকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ম্যানেজিং ডিরেক্টর
(এমডি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের বর্তমান অবস্থা, তার এয়ারলাইনের
উড়োজাহাজ বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক রুটে মার্কেট শেয়ার বাড়ানোর
লক্ষ্য নিয়ে কথা বলেন।
বাংলাদেশের এভিয়েশন
খাতকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
বিশ্বের সবচেয়ে
ব্যয়বহুল শিল্পগুলোর একটি হলো এভিয়েশন খাত। একটি উড়োজাহাজ কেনা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ।
একটি ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের দাম কনফিগারেশন অনুযায়ী প্রায় এক হাজার থেকে দেড়
হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
এতো ব্যয়বহুল সম্পদ
পরিচালনার জন্য অত্যন্ত দক্ষ পাইলট ও প্রকৌশলীসহ অন্যান্য জনবল প্রয়োজন। কিন্তু
বাংলাদেশে এখনো শক্তিশালী এভিয়েশন ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠেনি। দেশে যুক্তরাষ্ট্রের
এফএএ বা ইউরোপের ইএএসএ-এর মতো সংস্থার কাছ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এভিয়েশন
ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল বা বিশ্বমানের পাইলট প্রশিক্ষণ একাডেমি নেই।
ফলে দেশীয়
এয়ারলাইনগুলোকে বিদেশি পাইলট ও প্রকৌশলীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে পরিচালন
ব্যয় বেড়ে যায়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো
এভিয়েশন খাতের সহায়ক শিল্পের অভাব। তৈরি পোশাক শিল্পের মতো, এই খাতে এখনো এ ধরনের
শক্তিশালী সহায়ক শিল্প গড়ে উঠেনি।
রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামোর
ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ছোটখাটো রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বিমানবন্দরের র্যাম্পেই
করা যায়। কিন্তু বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অনুমোদিত হ্যাঙ্গার দরকার।
বর্তমানে বাংলাদেশে এফএএ অনুমোদিত কোনো হ্যাঙ্গার নেই। ফলে বড় ধরনের
মেইনটেন্যান্সের জন্য বিমান বিদেশে পাঠাতে হয়।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স
দেশের প্রথম এফএএ মানসম্পন্ন হ্যাঙ্গার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা শীঘ্রই চালু করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আপনার এয়ারলাইনের
উড়োজাহাজ বহর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা কী?
সেবার মান এবং
উড়োজাহাজের আধুনিকতা, এই দুই ক্ষেত্রেই আমাদের কৌশল হলো আন্তর্জাতিক মান বজায়
রাখা।
বাংলাদেশের বেসরকারি
এভিয়েশন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইউএস-বাংলা একেবারে নতুন বোয়িং ৭৩৭ ন্যারো-বডি
উড়োজাহাজ পরিচালনা করতে যাচ্ছে। প্রথম উড়োজাহাজটি মে থেকে জুনের মধ্যে দেশে আসার
কথা রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইনগুলো সাধারণত
ব্যবহৃত উড়োজাহাজ পরিচালনা করেছে। ইউএস-বাংলাই প্রথম সরাসরি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান
থেকে নতুন ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ দেশে আনছে।
আমরা আমাদের উড়োজাহাজ
বহরও বাড়াচ্ছি। লক্ষ্য হলো বিশ্বের শীর্ষ এয়ারলাইনগুলোর মতো আধুনিক উড়োজাহাজ বহর
গড়ে তোলা। এমিরেটস বা সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের মতো এয়ারলাইনগুলোর উড়োজাহাজের
গড় বয়স তুলনামূলক কম। আমরাও সেই পথে এগোতে চাই। আগামী চার বছরের মধ্যে আমাদের
উড়োজাহাজ বহরের গড় বয়স ৬-৯ বছরের মধ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের প্রতিশ্রুতি
অনুযায়ী বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে কী করা দরকার?
শুধু বিমানবন্দর বানালেই
এভিয়েশন হাব তৈরি হয় না। এর জন্য দরকার শক্তিশালী দেশীয় এয়ারলাইন, যারা
যাত্রীদের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারবে।
বিদেশি এয়ারলাইনগুলো
সাধারণত পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ফ্লাইট পরিচালনা করে। তারা বাংলাদেশের মতো করে
কানেক্টিং ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারে না।
ট্রানজিট অবকাঠামোও
গুরুত্বপূর্ণ। বিমানবন্দরে ভালো লাউঞ্জ, দ্রুত ট্রান্সফার সুবিধা এবং সহজ
ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা থাকতে হবে। ট্রানজিট যাত্রীরা চাইলে স্বল্প সময়ের জন্য
বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে শহর ঘুরে দেখতে পারলে পর্যটনও বাড়বে।
দুবাই ও দোহার মতো শহরগুলো
এভিয়েশন, পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতকে একত্রিত করে সফল এভিয়েশন হাব গড়ে তুলেছে।
দেশীয় এয়ারলাইনগুলো
বর্তমানে ২৫-৩০ শতাংশ আন্তর্জাতিক যাত্রী বহন করছে? কীভাবে যাত্রীসংখ্যা এর চেয়ে
আরও বেশি বাড়ানো যেতে পারে?
বর্তমানে আন্তর্জাতিক
যাত্রীদের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বহন করছে বাংলাদেশের দুই এয়ারলাইন, বিমান
বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও ইউএস-বাংলা। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের বাকি অংশ বিদেশি
এয়ারলাইনগুলোর দখলে।
যাত্রীসংখ্যা বাড়াতে হলে
সেবার মান উন্নত করা, উড়োজাহাজ বহর আধুনিক করা এবং সময়নিষ্ঠতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্বজুড়ে উড়োজাহাজ প্রায় একই রকম হলেও যাত্রীর অভিজ্ঞতায় পার্থক্য থাকে।
আরামদায়ক আসনব্যবস্থা, কেবিনের পরিচ্ছন্নতা, সংযোগ সুবিধা এবং সামগ্রিক সেবার মান
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যদি দেশীয় এয়ারলাইনগুলো
আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তারা আন্তর্জাতিক বাজারের
৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দখল করতে পারে।
ইউএস-বাংলার লক্ষ্য হলো
নিজস্ব উড়োজাহাজ বহর বাড়ানো এবং পরিকল্পনায় নতুন গন্তব্য যুক্ত করে ২০২৭ সালের
মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ অর্জন করা।
কীভাবে এই লক্ষ্য অর্জন
করবেন?
আমাদের একটি কৌশল হলো
চট্টগ্রাম ও সিলেটে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাড়িয়ে দেশকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে
তোলা।
চট্টগ্রামের অনেক যাত্রী
মধ্যপ্রাচ্যে যাতায়াত করে। তাই আমরা চট্টগ্রামে তিনটি উড়োজাহাজ স্থায়ীভাবে
রাখার পরিকল্পনা করছি। ফলে সেখান থেকে সরাসরি দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহতে ফ্লাইট
পরিচালনা করা যাবে।
একইভাবে সিলেট থেকেও
মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাজ্যে আকাশযাত্রায় যাত্রীদের সেবা দিতে কার্যক্রম বাড়ানো
হবে। এতে ঢাকার ওপর চাপ কমবে এবং যাত্রীরাও সুবিধা পাবেন।
নতুন কোন আন্তর্জাতিক রুট
বিবেচনায় আছে কী?
প্রবাসীদের চাহিদা বেশি
এমন কয়েকটি গন্তব্য নিয়ে আমরা কাজ করছি।
সম্ভাব্য গন্তব্যগুলোর
মধ্যে রয়েছে জেদ্দা, মদিনা, দক্ষিণ কোরিয়া, কুয়েত ও ব্রুনাই। যাত্রী চাহিদা ও
বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী এসব রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে।
যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা
উন্নয়নে কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
নিরাপত্তা আমাদের
সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইন হিসেবে ইউএস-বাংলা
আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) থেকে আইওএসএ সনদ অর্জন
করেছে।
আইওএসএ অডিট নিয়মিত হয়
এবং এতে বিশ্বের শীর্ষ এয়ারলাইনগুলোর অভিজ্ঞ অডিটররা অংশ নেন। আমরা আধুনিক
ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করি, যার মাধ্যমে ফ্লাইট ডেটা বিশ্লেষণ করে
যেকোনো অস্বাভাবিকতা দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
প্রশিক্ষণেও আমরা বড়
বিনিয়োগ করছি। এ বছর প্রায় ১০০ জন পাইলট এবং ৫০ জন প্রকৌশলীকে উন্নত প্রশিক্ষণের
জন্য বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক
কাঠামোতে কী ধরনের সংস্কার দরকার?
বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক
কাঠামোকে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও)-এর মানের সঙ্গে আরও
সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের সফল
এভিয়েশন কর্তৃপক্ষগুলো দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর নিয়ম-কানুন মেনে চলছে। বাংলাদেশও
তাদের কাছ থেকে শিখে ফ্লাইট পরিচালনা, প্রকৌশল তদারকি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং
নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় উন্নতি করতে পারে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক
পরামর্শক ও স্বীকৃত অডিটরদের সহায়তা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশ আইকাও
অনুমোদিত অডিটরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের এভিয়েশন ব্যবস্থা মূল্যায়ন করায়।
প্রাতিষ্ঠানিক
ধারাবাহিকতাও জরুরি। এভিয়েশন একটি অত্যন্ত কারিগরি খাত, যেখানে দক্ষতা অর্জনে
অনেক সময় লাগে। ঘন ঘন কর্মকর্তা বদলি হলে সেই দক্ষতা গড়ে ওঠা কঠিন হয়।
বেবিচকে কি আরও বেশি
স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত করা উচিত?
কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই করা
উচিত। নিয়োগ ও সাংগঠনিক কাঠামোর মতো বিষয়ে সরকারের সামগ্রিক তত্ত্বাবধানের আওতায়
বেবিচকের কিছুটা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকা দরকার।
বর্তমানে অনেক সিদ্ধান্ত
নিতে মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা কাজের গতি
কমিয়ে দেয়। স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সংস্থাটি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
আগামী ৫ বছরে
ইউএস-বাংলাকে কোথায় দেখতে চান?
আগামী ৫ বছরে আমরা
আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থিতি আরও বাড়াতে চাই। পাশাপাশি বাংলাদেশি এয়ারলাইনগুলোর
মধ্যে আমরা একাই বাজারের প্রায় ৫০ শতাংশ অর্জন করার লক্ষ্য নিয়েছি।
আমরা একটি বড় এভিয়েশন
প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ে তুলতে চাই, যেখানে পাইলট, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু এবং
গ্রাউন্ড স্টাফসহ সবাই একই ছাদের নিচে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে।
এছাড়া একটি এমআরও
(মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল) সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ভবিষ্যতে বেসরকারি উদ্যোগে একটি এভিয়েশন হাব গড়ে তোলার সম্ভাবনাও আমরা খতিয়ে
দেখছি।
বাংলাদেশে ২২ কোটিরও বেশি
মানুষ এবং বৃহৎ প্রবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে। ফলে উড়োজাহাজে ভ্রমণের চাহিদা ভবিষ্যতে
বাড়তেই থাকবে।
তবে সেই সম্ভাবনা কাজে
লাগাতে হলে শুধু বিমানবন্দর নির্মাণ করলেই হবে না। প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং
আন্তর্জাতিক মানের সেবা উন্নত করে একটি পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে
হবে।