বিমানের ফ্লাইটের ভেতর যাত্রীদের তাণ্ডব, পাইলট-ক্রুদের অবরুদ্ধ করে বিশৃঙ্খলা
সিনিয়র প্রতিবেদক
| Published: Wednesday, March 25, 2026
ফাইল ছবি
বৈরী আবহাওয়ার কারণে সিলেটে নামতে ব্যর্থ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ঢাকায় অবতরণ করে। 'কেন সিলেটে বিমান নামলো না', কিছু যাত্রী এমন অভিযোগে এয়ারক্রাফটের ভেতর বিশৃঙ্খলা করেন। মোবাইল ছিনিয়ে কেবিন ক্রুদের বন্দি করে রাখেন। তারা পাইলটদের ককপিটেও আটকে রাখার হুমকি দেন। কয়েক ঘণ্টা ধরে বিমানটি যেন এক ভয়ঙ্কর কেল্লা হয়ে দাঁড়ায়।
ঘটনাটি গত ১৪ মার্চের। আবুধাবি থেকে সিলেটগামী বিজি-২২৮ ফ্লাইটটি প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সিলেটে অবতরণ করতে না পেরে ঢাকায় ডাইভার্ট হয়। যাত্রীদের সুবিধার্থে দ্রুতই তাদের বিকল্প ডমেস্টিক ফ্লাইটে সিলেটে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এ সিদ্ধান্তে যাত্রীরা অসন্তোষ প্রকাশ করে পরিস্থিতি জটিল করে তোলেন। তারা প্লেন পরিবর্তন না করে এই প্লেনে সিলেট যাবেন বলে চিৎকার-চ্যাচামেচি করেন।
ফ্লাইটটির পাইলট ইন কমান্ড ছিলেন ক্যাপ্টেন এনাম তালুকদার। তাঁর সঙ্গে ফার্স্ট অফিসার কাদেরসহ আরও একজন ফার্স্ট অফিসার দায়িত্বে ছিলেন। কেবিন ক্রুদের নেতৃত্বে ছিলেন চিফ পার্সার হাফসা আহমেদ শিল্পি। ফ্লাইট পার্সার ফাহিমসহ মোট ৮ থেকে ৯ জন ক্রু এ ঘটনায় আক্রান্ত হন।
ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের এক কেবিন ক্রু বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফ্লাইট ডাইভার্ট হওয়ার পর থেকেই যাত্রীদের একটি অংশ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তাদের শান্ত করার জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। যাত্রীরা উচ্চস্বরে চিৎকার করেন, কেবিন ক্রুদের উদ্দেশে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন এবং একপর্যায়ে ক্রুদের মোবাইল ফোন নিজেদের কাছে রেখে দেন, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
বোর্ডিং ব্রিজের সামনে যখন ফ্লাইটটি আনা হয় তখন কয়েকজন যাত্রী উচ্চস্বরে চিৎকার করতে থাকে, "পাইলটকে বের হতে দিও না, এরে আটকাও, আগে এরে আটকাও। একজনকেও বের হতে দিব না।"
তারা ক্রুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দরজা খুলতে বাধা দেন এবং একধরনের ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ক্রু বলেন, "আমরা কয়েক ঘণ্টা কার্যত বিমানের ভেতর জিম্মি অবস্থায় ছিলাম। দীর্ঘ সময় ধরে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো কার্যকর সহায়তা পাইনি। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই শঙ্কায় পড়তে হয়। যাত্রীদের এ ধরনের আগ্রাসী আচরণ সামাল দিতে গিয়ে আমরা চরম মানসিক চাপের মধ্যে ছিলাম।"
কয়েক ঘণ্টা পর যাত্রীদের একই বিমানেই ঢাকা থেকে সিলেটগামী নতুন যাত্রীদের তোলা হয়। এরপর ওই বিমানে করেই যাত্রীদের সিলেটে পাঠানো হয়।
সাব্বির হাসান নামে ফ্লাইটের একজন যাত্রী বলেন, “তখন সেহরির সময় ছিল। তারা সেহরি করানোর নামে আমাদের জোর করে প্লেন থেকে নামানোর চেষ্টা করছিল। আমরা একেবারেই মানিনি। কেউ আমাদের জোর করতে পারত না। আমরা নিজেরাই প্লেনের ভেতরই বসে রইলাম এবং চিৎকার করে জানালাম যে, আমরা এই বিমানে সিলেট যাব। আমাদের কোনো অবস্থাতেই জোর করে নামানো যাবে না।”
এ বিষয়ে বিমানের মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ বোসরা ইসলাম বলেন, "যাত্রীরা কোনভাবেই বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি বুঝতে চাচ্ছিলেন না। আমাদের ক্যাপ্টেন ও ক্রুরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাদের বুঝিয়েছেন। তারা একই বিমানে সিলেটে যেতে চাচ্ছিল। এই ফ্লাইটটির সিলেট থেকে লন্ডন যাওয়ার কথা ছিল। পরে বিমান সিলেটের যাত্রী তুলে একই এয়ারক্রাফটে তাদের সিলেটে পাঠায়।"
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগীব সামাদ বলেন, "১৪ তারিখ রাতে আবুধাবির একটি ফ্লাইট সিলেটে নামতে না পেরে ঢাকায় এসেছিল। পরবর্তীতে তাদের আবার সিলেটে পাঠানো হয়েছে। পাইলট-ক্রুদের অবরুদ্ধ করার আমার জানা নেই, এটা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।"
বিমান সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈরী আবহাওয়ার মতো অনিবার্য পরিস্থিতিতে ফ্লাইট ডাইভার্ট করা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের স্বাভাবিক নিয়ম। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যাত্রীদের সহযোগিতামূলক আচরণই নিরাপদ ও দ্রুত সমাধানের জন্য জরুরি। কিন্তু এ ঘটনায় যাত্রীদের অসহযোগিতা ও বিশৃঙ্খল আচরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এবং ফ্লাইট পরিচালনায় অযাচিত বিলম্ব সৃষ্টি করে।