৩১ বছরের অনিয়ম
বাপা সভাপতি সহ ৪ পাইলটের বিরুদ্ধে লাইসেন্স জালিয়াতির অভিযোগ
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Friday, April 03, 2026
কোলাজ: এভিয়েশন এক্সপ্রেস
বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পাইলটস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সভাপতি ও বিমানের বোয়িং ৭৭৭ ফ্লিট চিফ ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবের বিরুদ্ধে ৩১ বছর ধরে অবৈধ লাইসেন্স ব্যবহার করে বাণিজ্যিক বিমান উড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত গণমাধ্যমের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত ৪ পাইলট বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) নির্ধারিত বেসরকারি ও বাধ্যতামূলক ফ্লাইট ঘণ্টা পূরণের শর্ত ছাড়াই বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্স পান। এতে যাত্রী নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন মানদন্ডে বাংলাদেশের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও)-এর নির্দেশনা অনুসরণ করে বানানো বেবিচকের নিয়ম অনুযায়ী, পাইলটদের বাণিজ্যিক লাইসেন্স পেতে কমপক্ষে ২০০ ঘণ্টা ফ্লাইট পরিচালনা করতে হবে। এর সাথে এককভাবেও ১০০ ঘণ্টা ফ্লাইট চালানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে নথি ঘেটে জানা গেছে, এই পাইলটরা অনেক কম সময়ের অভিজ্ঞতায় লাইসেন্স পেয়েছেন।
ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবের ১৬ এপ্রিল ১৯৯২ সালে পাওয়া সার্টিফিকেটে দেখা যায়, বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার লাইসেন্স পাওয়ার সময় তার মাত্র ৩৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট এককভাবে ফ্লাইট পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল। ১৯৯২ সালের ১০ জুন বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স একাডেমি থেকে পাওয়া অন্য একটি সার্টিফিকেটে দেখা যায় যে তিনি ১৫৫ ঘণ্টা কমান্ড পাইলট হিসেবে ফ্লাইট পরিচালনা করেছেন।
তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৯২ সালের ২৫ এপ্রিল জারি করা নথিতে উল্লেখ আছে, ফ্লাইট প্রশিক্ষণে ধীরগতির কারণে বাসিত মাহতাবকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী থেকে বের করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, সে যে ১৫৫ ঘণ্টার সার্টিফিকেট পেয়েছেন তা মূলত বিমান বাহিনীর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরেই পেয়েছেন। এতে এই সার্টিফিকেটও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে।
বিমানের বোয়িং ৭৩৭ পরিচালনা করেন ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আখন্দ। সর্বনিম্ন যতটুকু সময়ে ফ্লাইট চালানোর অভিজ্ঞতা থাকা দরকার তার অর্ধেক সময়ের অভিজ্ঞতায় তিনি লাইসেন্স পেয়ে যান। নথি দেখায় যে তিনি মাত্র ২৬ ঘণ্টা ৫ মিনিট এককভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করেছেন।
বাধ্যতামূলকভাবে ২০০ ঘণ্টা ফ্লাইট চালানোর অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হলেও ক্যাপ্টেন আনিস আহমেদ লাইসেন্স পেতে যে সার্টিফিকেটে জমা দিয়েছেন তাতে তার মোট ১৬২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট ফ্লাইট চালানোর অভিজ্ঞতা দেখা গেছে।
ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদের বিরুদ্ধে লগবুকে ডুপ্লিকেট এন্ট্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। লগবুকের পি১ এবং পি২ কলামে একই ফ্লাইট টাইম লেখা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে যে তিনি এভাবেই ঘণ্টার হিসাব কৃত্রিমভাবে বাড়িয়েছেন।
বিমানের প্রাথমিক তদন্ত কমিটির মতে অভিযোগগুলিকে সংবেদনশীল। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত পাইলটদেরকে কার্যক্রম স্থগিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে এয়ারলাইন তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেনি। বরং তারা গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুটেই ফ্লাইট পরিচালনা করে যাচ্ছেন।
গণমাধ্যম থেকে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত পাইলটরা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন।
ক্যাপ্টেন বাসিত গণমাধ্যমে বলেন, “এগুলো স্পষ্টভাবে মিথ্যা। এই কাজ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে করছে। ৩৫ বছর ধরে … আপনি বুঝেন না এগুলো কী?”
কোনো বক্তব্যই দিতে না চেয়ে ক্যাপ্টেন আখন্দ গণমাধ্যমে বলেন, “সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলুন। বিমান বা সিভিল এভিয়েশন অথরিটির সঙ্গে কথা বলুন।”
এ বিষয়ে গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) মোফিজুর রহমান, বাংলাদেশ এভিয়েশন অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল, সতর্ক করে বলেন যে পাইলট লাইসেন্সিং সমস্যা দ্রুত সমাধান না হলে এভিয়েশন খাতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, “আমাদের ব্যবস্থার দুর্বলতা আইকাওয়ের মতো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা প্রদত্ত মানের ওপর বড়ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।”
গণমাধ্যমের কাছে পাঠানো বেবিচকের সংক্ষিপ্ত লিখিত বিবৃতি হলো, “অভিযুক্ত পাইলটদের ব্যাপারে বিস্তারিত পর্যালোচনা চলমান।” ১৯ ফেব্রুয়ারি গঠিত তদন্ত কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল। তবে ১ মাস ১৩ দিন পরও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি।
বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার লাইসেন্স বেবিচকের ফ্লাইট সেফটি রেগুলেশন (এফএসআর) বিভাগ থেকে দেওয়া হলেও কিছু পাইলট জনবল বিভাগ থেকে কম সময় ফ্লাইট চালানোর অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্স পেয়ে যায়। বেশ কয়েকবার প্রতারণা শনাক্তের পর বেবিচক পদক্ষেপ নিলেও অনেক ক্ষেত্রেই এই কর্তৃপক্ষ উদাসীন থাকছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বেবিচক এই ধরনের অনিয়ম বন্ধ না করে তবে বাংলাদেশের আকাশসীমা গুরুতর হুমকির মুখে পড়বে। পাশাপাশি যাত্রী নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হবে।