Logo
এয়ারলাইন্স এয়ারপোর্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স পর্যটন হোটেল প্রবাস লাইফস্টাইল কর্পোরেট রেগুলেটরস মুখোমুখি

Aviation Express

বেবিচকের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ: আইকাওয়ের কালো তালিকাভুক্ত হতে পারে বাংলাদেশ

বেবিচকের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ: আইকাওয়ের কালো তালিকাভুক্ত হতে পারে বাংলাদেশ

ছবি: এভিয়েশন এক্সপ্রেস

-তারেক আলিফ


বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় শিথিলতা, দায়িত্বহীন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পরিচালনাগত দুর্বলতা এবং ধারাবাহিক নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ফলে বিমান ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। পরিস্থিতির এমন থাকলে আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন সংস্থার (আইকাও) কালো তালিকাভুক্ত হতে পারে বাংলাদেশ।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইকাওয়ের তালিকায় বাংলাদেশ কালো তালিকাভুক্ত হলে দেশের এয়ারলাইন্সগুলো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়বে। নতুন রুট চালু করা কঠিন হয়ে যাবে, উড়োজাহাজ লিজ নেওয়া বাধাগ্রস্ত হবে, কোড শেয়ার চুক্তি সীমিত হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হবে।


বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের সিভিল এভিয়েশন (সংশোধনী) অধ্যাদেশের মাধ্যমে বেবিচকের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ব্যাহত হচ্ছে এবং আইকাও-এর বাধ্যতামূলক মান রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।


বেবিচকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “২০১৭ সালের সিভিল এভিয়েশন আইনের ১৪ ধারায় চেয়ারম্যানকে দ্রুত নিরাপত্তা বিধি জারি ও সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, যাতে আইকাও'র সময়সীমা মেনে চলা যায়। কিন্তু ২০২৫ সালের গেজেটেড সংশোধনীতে অস্পষ্ট সময়সীমা, বহুস্তর অনুমোদন এবং জটিল প্রক্রিয়া যুক্ত হওয়ায় আইকাও'র নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে, যা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানের পেছনে ঠেলে দিচ্ছে।”


সাবেক বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম এম মফিদুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।


তিনি বলেন, “শিকাগো কনভেনশনের অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার স্বাধীনতা। যদি এমন আইন করা হয় যা এই স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করে, তবে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সরাসরি লঙ্ঘন।”


তার মতে, এর প্রভাব শুধু আইকাও অডিটেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ফোরামে বাংলাদেশ নেতিবাচক অবস্থানে পড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লাইট পরিচালনার পূর্বশর্ত এফএএ ক্যাটাগরি-১ মর্যাদা অর্জন প্রায়ই অসম্ভব হয়ে উঠবে। আইসিএও হয় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগ ঘোষণা করতে পারে অথবা প্রশাসনকে আইন সংশোধনে বাধ্য করতে পারে।


অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এত বড় আইন আনার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাবেক এই চেয়ারম্যান। “অন্তর্বর্তী সরকারের এমন গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের নৈতিক বা সাংবিধানিক ম্যান্ডেট নেই। এর জন্য সংশ্লিষ্টদের জনসমক্ষে ব্যাখ্যা দিতে হবে,” বলেন তিনি।


পরিস্থিতি যে দিকে যাচ্ছে তা নিয়ে নিজের শঙ্কার কথার প্রকাশ করেন এম এম মফিদুর রহমান।


বাংলাদেশে ২০২২ সালে আইকাও'র অডিট হওয়ার কথা ছিল। প্রস্তুতির অভাবে একাধিকবার পিছিয়েছে এই অডিট। প্রথমে ২০২৪, পরে ২০২৬ সালের মার্চে গিয়ে ঠেকেছিল এই অডিট।

তবে, সম্প্রতি নির্বাচনের অজুহাত দেখিয়ে বেবিচক আইকাওকে অডিট আরও পেছানোর অনুরোধ জানায়। এই অডিট ২০২৬ সালের শেষ ভাগ বা ২০২৭ সালের শুরুতে হতে পারে।


এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সেক্রেটারি জেনারেল মো. মফিজুর রহমানও বিমানের এই নিয়ন্ত্রণমূলক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, আইনগতভাবে বেবিচক একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হলেও বাস্তবে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে এর ক্ষমতা কমে গেছে। তার মতে, যদিও বেবিচক চেয়ারম্যানের আর্থিক ক্ষমতা সীমিত (প্রায় ৩০–৪০ কোটি), তবুও বেশিরভাগ কৌশলগত ও পরিচালনাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এখনো মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ জটিল ও ধীরগতির হচ্ছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনাও দুর্বল হচ্ছে।


লাইসেন্সবিহীন পরিদর্শকদের হাতে পাইলট লাইসেন্স

বেবিচকের বিরুদ্ধে কমার্শিয়াল পাইলটদের লাইসেন্সিং তদারকি ব্যবস্থাকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।


সূত্র জানায়, আইকাও ডকুমেন্ট ৮৩৩৫ (অনুচ্ছেদ ৬.২.১.১) অনুযায়ী পাইলটের লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়নের দায়িত্বে থাকা ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টরদের (এফওআই), বৈধ পাইলট লাইসেন্স, হালনাগাদ টাইপ রেটিং এবং পূর্ণাঙ্গ উড্ডয়ন দক্ষতা থাকা বাধ্যতামূলক। একই শর্ত বেবিচকের বিধিমালাতেও রয়েছে।


কিন্তু বেবিচকের একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমানে দায়িত্ব পালনকারী অধিকাংশ ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টরদের বৈধ এয়ার ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স (এটিপিএল) নেই। কারো লাইসেন্স ১০–১৯ বছর আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। তবুও তারা লাইসেন্স অনুমোদন ও অডিট পরিচালনা করছেন।

বর্তমানে দায়িত্বে থাকা ছয়জন ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টরের মধ্যে পাঁচজনের পাইলট লাইসেন্সের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।


সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ক্যাপ্টেন রফিউল হকের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৬ সালে, ক্যাপ্টেন ফরিদ উজ জামানের ২০১৫ সালে, ক্যাপ্টেন আশরাফুল আজহারের ২০১৬ সালে, ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ মিয়ার ২০১৫ সালে এবং ক্যাপ্টেন মনিরুল হক জোয়ার্দারের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয় ২০২৫ সালের জুলাই মাসে।


আরেক কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ফেরদৌস হোসেন ৬৮ বছর বয়সে এয়ার ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স (এটিপিএল) অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ওই সময় প্রয়োজনীয় মেডিকেল ডকুমেন্ট সিএএবি যথাযথভাবে যাচাই করেনি। এটি আইকাও বিধিমালার স্পষ্ট পরিপন্থী বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধ লাইসেন্সবিহীন ইন্সপেক্টররা পাইলটের দক্ষতা মূল্যায়ন, সিমুলেটর চেক, মেডিকেল সনদ যাচাই বা প্রশিক্ষণ অনুমোদনের আইনগত ও কারিগরি সক্ষমতা রাখে না। এর ফলে পুরো লাইসেন্সিং ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।


যোগ্যতা ও নিরাপত্তা তদারকিতে গুরুতর ঘাটতি

আইকাও ও বেবিচকের বিধি অনুযায়ী, একজন ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টর হতে ন্যূনতম ৫০০০ ঘণ্টা কমান্ড ফ্লাইট অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। কিন্তু ক্যাপ্টেন আশরাফুল আজহারসহ কয়েকজন কর্মকর্তা এই শর্ত পূরণ করেননি এবং তাদের বাণিজ্যিক কমান্ড অভিজ্ঞতাও নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।


কিছু ইন্সপেক্টর আগে মেডিকেল বা প্রশিক্ষণ ব্যর্থতার কারণে এয়ারলাইন থেকে অপসারিত হলেও এখন তারাই দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন ও প্রশিক্ষণ সংস্থার (এটিও) অডিট ও অনুমোদন দিচ্ছেন।


বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে এসব অডিট অবৈধ হিসেবে গণ্য হলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হবে।


আইকাও'র কালো তালিকাভুক্ত হলে কী হতে পারে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, লাইসেন্সবিহীন পরিদর্শক নিয়োগ, অবৈধ লাইসেন্স প্রদান, অতিরিক্ত ফ্লাইট আওয়ার, নিয়ন্ত্রক কাঠামো দুর্বল করা এবং তদারকির ঘাটতির কারণে আইকাও বাংলাদেশকে গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। এ ধরনের ঘোষণা এলে দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়বে। নতুন রুট চালু করা কঠিন হয়ে যাবে, উড়োজাহাজ লিজ নেওয়া বাধাগ্রস্ত হবে, কোড শেয়ার চুক্তি সীমিত হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হবে।


এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ), ইউরোপীয় ইউনিয়নের এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি এবং আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও নেতিবাচক মূল্যায়ন আসতে পারে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। আইকাও’র মানসম্মত লাইসেন্সিং ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা, ফ্লাইট টাইম সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা, যোগ্য পরিদর্শক নিয়োগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা বজায় রাখা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। তা না হলে বাংলাদেশের বিমান চলাচলের সুনাম ও বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।


একজন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন, “এই অনিয়মগুলো যদি চলতেই থাকে, তাহলে পরবর্তী আইকাও-এর অডিটে উত্তীর্ণ হওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।”

Make Comment

Login to Comment
Leaving AviationExpress Your about to visit the following url Invalid URL

Loading...
Comments


Comment created.

Related News