পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে বিমানে উঠছেন? যাত্রীদের যা জানা জরুরি
ছবি: সংগৃহীত
ছুটির মৌসুমে ভ্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এবং যাত্রীদের ব্যাগে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও পাওয়ার ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ায়, বিমানে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বহনের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে এয়ারলাইন্স ও বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ক্যামেরা ও ই-সিগারেটসহ দৈনন্দিন ব্যবহৃত বহু ডিভাইসে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে এগুলো নিরাপদ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত, অতিরিক্ত গরম বা ভুলভাবে প্যাক করা হলে আগুন ধরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে বিমানের কার্গো হোলে এমন আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ)–এর গবেষণায় দেখা গেছে, সচেতনতা ও বাস্তব আচরণের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। জরিপে ৯৩ শতাংশ যাত্রী দাবি করেছেন, তারা লিথিয়াম ব্যাটারির নিয়ম সম্পর্কে জানেন। কিন্তু বাস্তবে প্রায় অর্ধেক যাত্রী ডিভাইস ভুলভাবে প্যাক করেন, যার বেশিরভাগই চেক-ইন লাগেজে রাখা হয়।
আইএটিএর আরেকটি জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ৮৩ শতাংশ যাত্রী মোবাইল ফোন, ৬০ শতাংশ ল্যাপটপ এবং ৪৪ শতাংশ যাত্রী পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে ভ্রমণ করেন। ডিভাইসের সংখ্যা বাড়ায় সঠিকভাবে বহন করা এখন শুধু নিয়ম নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যু হয়ে উঠেছে।
লিথিয়াম ব্যাটারি বহনে যাত্রীদের জন্য ৭ নির্দেশনা
- আইএটিএ ও এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের জন্য সাতটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে—
- প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডিভাইস ও ব্যাটারি বহন না করা
- কোনো ডিভাইস অতিরিক্ত গরম, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধোঁয়া বের হলে সঙ্গে সঙ্গে কেবিন ক্রুকে জানানো
- ব্যাটারির ক্ষমতা জানা—১০০ ওয়াট-ঘণ্টার বেশি হলে এয়ারলাইনের অনুমতি লাগতে পারে
- সব ডিভাইস হ্যান্ড ক্যারিতে রাখা, চেক-ইন লাগেজে নয়
- গেট-চেকড ব্যাগ হলে ব্যাটারি ও ডিভাইস বের করে নেওয়া
- অতিরিক্ত ব্যাটারির টার্মিনাল ঢেকে রাখা বা মূল প্যাকেটে রাখা
- নিজ নিজ এয়ারলাইনের নির্দিষ্ট নিয়ম আগে জেনে নেওয়া
পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে কড়াকড়ি বাড়াচ্ছে এয়ারলাইন্স
কিছু এয়ারলাইন্স ইতোমধ্যে আরও কঠোর নিয়ম চালু করেছে। এমিরেটস ও ফ্লাইদুবাই এক যাত্রীকে সর্বোচ্চ একটি পাওয়ার ব্যাংক বহনের অনুমতি দিচ্ছে, যার ক্ষমতা ১০০ ওয়াট-ঘণ্টার কম হতে হবে। এসব পাওয়ার ব্যাংক বিমানে চার্জ করা যাবে না, ওভারহেড বিনে রাখা যাবে না এবং অবশ্যই সিটের নিচে রাখতে হবে। চেক-ইন লাগেজে পাওয়ার ব্যাংক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সাম্প্রতিক ঘটনার পর বাড়ছে উদ্বেগ
চলতি বছরের জুলাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার ভার্জিন অস্ট্রেলিয়ার একটি ফ্লাইটে ওভারহেড লকারে রাখা পাওয়ার ব্যাংক থেকে আগুন লাগে বলে ধারণা করা হয়। মার্চে দক্ষিণ কোরিয়ার গিমহে বিমানবন্দরে একটি এয়ার বাসান বিমানে এবং মে মাসে চীনের একটি ফ্লাইটে পাওয়ার ব্যাংক থেকে ধোঁয়া বের হওয়ায় জরুরি অবতরণ করতে হয়। এসব ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে এয়ারলাইন্সগুলো লিথিয়াম ব্যাটারি সংক্রান্ত নিরাপত্তা নির্দেশনা আরও জোরদার করেছে।
ভুল ধারণা এখনো কাটেনি
আইএটিএ জানায়, অনেক যাত্রী এখনো মনে করেন ছোট ডিভাইস বা পাওয়ার ব্যাংক চেক-ইন লাগেজে রাখা যায়। কিন্তু বাস্তবে হ্যান্ড ব্যাগই লিথিয়াম ব্যাটারিযুক্ত ডিভাইস রাখার একমাত্র নিরাপদ জায়গা, যেখানে কোনো সমস্যা হলে কেবিন ক্রু দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাব, ক্যামেরা, স্মার্টওয়াচ, পাওয়ার ব্যাংক ও ই-সিগারেটসহ সব লিথিয়ামচালিত ডিভাইস কেবিনেই রাখতে হবে। ১০০ ওয়াট-ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যাটারি সাধারণত অনুমোদিত, ১০০–১৬০ ওয়াট-ঘণ্টার জন্য এয়ারলাইনের অনুমতি প্রয়োজন, আর এর বেশি হলে বহন নিষিদ্ধ।
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
লিথিয়াম ব্যাটারি হঠাৎ অতিরিক্ত গরম হয়ে আগুন ধরাতে পারে। কার্গো হোলে এ ধরনের ঘটনা দ্রুত মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, কিন্তু কেবিনে হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এ কারণেই সব নিয়মের মূল লক্ষ্য যাত্রী ও বিমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধোঁয়া বের হওয়া ব্যাটারি স্পর্শ না করে কেবিন ক্রুর নির্দেশনা অনুসরণ করতে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম ধাপ শুরু হয় যাত্রার আগেই সঠিকভাবে ব্যাগ গুছানোর মাধ্যমে।
সূত্র: আইএটিএ, সিম্পল ফ্লাইং, এটিএসবি, উইকিপিডিয়া, ভিএনএক্সপ্রেস