সাড়ে তিন ঘণ্টায় মহাসাগর পাড়ি: কনকর্ডের উত্থান আর শেষ উড্ডয়ন
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Thursday, January 22, 2026
ছবি: সংগৃহীত
আকাশের নীল বুকে শব্দের সীমা ভেঙে যে বিমান একসময় দাপটের সঙ্গে ছুটে বেড়িয়েছিল, তার নাম কনকর্ড—গতি, প্রযুক্তি আর বিলাসের এক অনন্য প্রতীক। ১৯৭৬ সালের ২১ জানুয়ারি লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে যখন প্রথম বাণিজ্যিক কনকর্ড আকাশে উড়েছিল, তখন কিশোর জন টাই দাঁড়িয়ে ছিলেন রানওয়ের পাশে। বিস্ময়ে জমে থাকা সেই দৃশ্য তার মনে এমনভাবে গেঁথে যায় যে ঠিক দুই দশক পর তিনি নিজেই কনকর্ডের ককপিটে বসে আকাশ জয়ের অংশীদার হন। তার ভাষায়, সেই অনুভূতি ছিল স্বপ্নের মতো—যা পুরোপুরি শব্দে ধরা যায় না।
সেভিলের আকাশে সূর্য যখন অস্ত যাচ্ছিল, তখন রোলস-রয়েস অলিম্পাস ইঞ্জিনের গর্জন প্রথমবার শোনেন টাই। পুরো বিমান কেঁপে উঠেছিল, আর তার শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এক অদ্ভুত শিহরণ। তিন, দুই, এক—গণনা শেষ হতেই থ্রটল এগিয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যেই প্রচণ্ড ত্বরণে সিটের সঙ্গে সেঁটে যাওয়ার সেই অভিজ্ঞতা ছিল তার দীর্ঘ বৈমানিক জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় সময়গুলোর একটি।
প্রায় তিন দশক ধরে কনকর্ড আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায়। সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানের তুলনায় এটি ছিল যেন ফর্মুলা ওয়ানের মতো—দ্রুত, ধারালো আর ব্যতিক্রমী। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ও এয়ার ফ্রান্সের হাতে গোনা কয়েকজন পাইলটই কেবল এই গতির স্বাদ পেয়েছিলেন। পিটার ডাফি কিংবা জক লোর মতো অভিজ্ঞ পাইলটরা শুরু থেকেই এর বিবর্তনের সাক্ষী ছিলেন। জক লো স্মৃতিচারণায় বলেন, প্রায় ৬৩ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে গিয়ে তারা পৃথিবীর বাঁক আর মহাকাশের গভীর অন্ধকার একসঙ্গে দেখতেন। শব্দের দেয়াল ভাঙার মুহূর্তে কোনো বড় ঝাঁকুনি না থাকলেও ককপিটের যন্ত্রপাতিতে হালকা কম্পন দেখা যেত—যা বুঝিয়ে দিত, বিমানটি এখন সুপারসনিক গতিতে।
এই ঘোষণা তখন যাত্রীদের জন্য ছিল বিশেষ এক মুহূর্ত—তারা শব্দের চেয়েও দ্রুতগতির এক ভিন্ন জগতে প্রবেশ করেছেন। বিমানের ভেতরটা ছিল আভিজাত্যে ভরা। মাত্র ১০০ জন যাত্রী নিয়ে চলা এই ছোট্ট বিমানে নিয়মিত যাতায়াত করতেন বিশ্বখ্যাত তারকা, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী আর রাজপরিবারের সদস্যরা। স্টিং, এলটন জন, মিক জ্যাগার কিংবা পল ম্যাককার্টনির মতো সংগীত তারকারা প্রায়ই ককপিটে গিয়ে পাইলটদের সঙ্গে গল্প করতেন। এমনকি রানী এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপও ছিলেন কনকর্ডের নিয়মিত যাত্রী।
পাইলট রিচার্ড ওয়েস্ট্রে জানান, কনকর্ডে উড়ান মানে ছিল বিশাল এক ব্যক্তিগত জেট চালানোর অনুভূতি। ক্রুরা নিয়মিত যাত্রীদের পছন্দ-অপছন্দ পর্যন্ত মুখস্থ রাখতেন। জানালার বাইরে তাকালে নিচে ছড়িয়ে থাকা ভূমি মানচিত্রের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠত।
তবে এই গৌরবের যাত্রার ইতি ঘটে ২০০৩ সালে। ২০০০ সালের ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং এরপর ৯/১১-এর হামলার পর বিমান ভ্রমণ নিয়ে মানুষের আস্থা নড়ে যায়। তার ওপর বিপুল রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও জ্বালানি অদক্ষতা কনকর্ডের ভবিষ্যৎ আরও কঠিন করে তোলে। শেষ পর্যন্ত কিংবদন্তি এই বিমানকে অবসরে পাঠানো হয়। শেষ উড্ডয়নের দিনটি পাইলটদের জন্য ছিল আবেগে ভরা ও বেদনাদায়ক।
আজ বুম সুপারসনিকের মতো প্রতিষ্ঠান নতুন প্রজন্মের সুপারসনিক বিমান তৈরির স্বপ্ন দেখালেও সাবেক কনকর্ড পাইলটদের মতে, খরচ আর পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এখনো বড় বাধা। তবু জন টাইয়ের মতো বৈমানিকদের মনে আজও সেই দিনগুলো অমলিন—যখন প্রতিটি সকাল শুরু হতো নিউইয়র্কের পথে শব্দের চেয়েও দ্রুতগতিতে উড়ে যাওয়ার রোমাঞ্চ নিয়ে। সূত্র: সিএনএন