১০ এয়ারবাস উড়োজাহাজ কিনছে বিমান, ৩১ আগস্টের মধ্যে চুক্তি
• ২০৩১ সাল থেকে যুক্ত হবে নতুন উড়োজাহাজ • ৪৭ উড়োজাহাজের মিশ্র বহর গড়ার পরিকল্পনা • এয়ারবাসের প্রবেশ বোয়িংয়ের একচেটিয়া অবস্থান ভাঙছে
জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভবিষ্যৎ বহরে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বোয়িং ও এয়ারবাস—উভয় নির্মাতার উড়োজাহাজ নিয়ে মিশ্র বহর পরিচালনার পথে হাঁটছে বিমান। একই সঙ্গে দেশের বিমান চলাচল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত এভিয়েশন এক্সপ্রেস-কে জানিয়েছেন, আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি সই করবে সরকার। নতুন উড়োজাহাজগুলো ২০৩১ সাল থেকে ধাপে ধাপে বিমানের বহরে যুক্ত হবে।
“আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে আমরা এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি সই করব। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর উড়োজাহাজের মূল্য এবং ক্রয়সংক্রান্ত অন্যান্য বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে,” বলেন মিল্লাত।
এই সিদ্ধান্ত বিমানের জন্য একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের সূচনা করছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্থাটির জেট বহরে বোয়িংয়ের আধিপত্য ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে আসা এয়ারবাস জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটিতে প্রথমবারের মতো শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে।
এদিকে, প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিচ্ছে বিমান। ফলে সংস্থাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বহর রূপান্তরের একটি অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
অবশেষে সুযোগ পেল এয়ারবাস
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এয়ারবাসের সর্বশেষ প্রস্তাবে রয়েছে চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ।
এই সমন্বয় বিমানের জন্য বিভিন্ন বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত উড়োজাহাজ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে। দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় রুট থেকে শুরু করে আঞ্চলিক, উপসাগরীয় এবং এশিয়ার ব্যস্ত রুটগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী উড়োজাহাজ পরিচালনা করা সহজ হবে।
এ৩৫০-৯০০ মূলত দীর্ঘপাল্লার ফ্লাইট পরিচালনার জন্য তৈরি। এটি ইউরোপসহ দূরবর্তী গন্তব্যে বিমানের সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, তুলনামূলক ছোট এ৩২১নিও আঞ্চলিক ও মধ্যপাল্লার রুটে পরিচালনার জন্য উপযোগী, যেখানে বড় ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ ব্যবহার সবসময় বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়।
অর্ডারটি নিশ্চিত করতে এয়ারবাসের ভাইস প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড ডেলাহায়ে সম্প্রতি ঢাকায় এসে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত এবং বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আলোচনা শেষে সরকার ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান মিল্লাত।
তিনি বলেন, আলোচনায় বাংলাদেশের জাতীয় ও বাণিজ্যিক স্বার্থই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি প্রধান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখাও এই সিদ্ধান্তের একটি বিবেচ্য বিষয়।
একসাথে বোয়িং ও এয়ারবাস
এয়ারবাস কেনার এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিমান ইতোমধ্যে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮।
প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের এই বোয়িং প্যাকেজ বিমানের ওয়াইডবডি ও ন্যারোবডি—উভয় ধরনের বহর উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করবে।
দুটি ক্রয় কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে আগামী দশকে বিমানের বহরে নতুন প্রজন্মের মোট ২৪টি বোয়িং ও এয়ারবাস উড়োজাহাজ যুক্ত হবে।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, বিমানের দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণ কোনো একক নির্মাতার ওপর নির্ভরশীল হবে না।
মিল্লাত বলেন, সরকার বিমানকে মিশ্র বহরের এয়ারলাইন হিসেবে গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করেছে। বিশ্বের দুই প্রধান বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ নির্মাতা—বোয়িং ও এয়ারবাস—উভয়ের উড়োজাহাজই বিমানের বহরে থাকবে।
এতে ভবিষ্যতে উড়োজাহাজ পরিচালনায় আরও বেশি নমনীয়তা তৈরি হবে এবং নতুন উড়োজাহাজ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সহায়ক সেবা নিয়ে আলোচনায় বিমানের দরকষাকষির অবস্থানও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য পাইলট প্রশিক্ষণ, প্রকৌশল, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো এবং বহর ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত সতর্ক পরিকল্পনা প্রয়োজন হবে, যাতে অতিরিক্ত জটিলতা ও ব্যয় সম্ভাব্য সুফলকে ছাড়িয়ে না যায়।
৪৭ উড়োজাহাজ বিশিষ্ট বহরের পথে বিমান
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করা হবে। সেই লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য শুধু নতুন উড়োজাহাজ যোগ করা নয়; বরং আন্তর্জাতিক আকাশ যোগাযোগ জোরদার করে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
বৃহত্তর ও বৈচিত্র্যময় বহর থাকলে বিদ্যমান রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো, নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্য চালু করা এবং যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত উড়োজাহাজ ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের চলমান বিমান অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনার সঙ্গেও এই কৌশল সামঞ্জস্যপূর্ণ। নতুন টার্মিনাল চালু হলে ঢাকার বিমানবন্দরের যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।
দেশের পর্যটন খাতের জন্যও উন্নত আন্তর্জাতিক সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে বিদেশি পর্যটক আগমন বাড়বে এবং বাংলাদেশে যাতায়াত আরও সহজ হবে।
চার বছরের বোয়িং-এয়ারবাস প্রতিযোগিতা
বিমানের বহর সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস ও যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের মধ্যে প্রায় চার বছর ধরে তীব্র প্রতিযোগিতা চলেছে।
প্রতিযোগিতা শুধু উড়োজাহাজের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বা দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ওয়াশিংটন এবং ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানী থেকেও কূটনৈতিক পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
২০২৩ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বাংলাদেশ সফরের সময় এয়ারবাসের প্রচারণা নতুন গতি পায়। এরপর ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার সম্ভাবনা ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে, যার মধ্যে কার্গো উড়োজাহাজও ছিল।
ইউরোপীয় পক্ষের মতে, বহরে বৈচিত্র্য আনলে একটি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমবে, ক্রয় আলোচনায় সুবিধা বাড়বে এবং ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও শিল্প সহযোগিতাও সম্প্রসারিত হবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিসহ বৃহত্তর বাণিজ্য আলোচনার প্রেক্ষাপটে বোয়িং শেষ পর্যন্ত ১৪টি উড়োজাহাজের অর্ডার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।
তবে বোয়িংয়ের সাফল্যের পরও এয়ারবাস প্রতিযোগিতা থেকে সরে যায়নি। বরং চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও নিয়ে নতুন প্রস্তাব দেয়, যা ভবিষ্যতের মিশ্র বহরের জন্য একটি সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ইউরোপের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত
এয়ারবাসের প্রস্তাবটি ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক আলোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম এবং প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত এবং জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠকে সরকার জানায়, বাংলাদেশের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বহর সম্প্রসারণ কর্মসূচিতে এয়ারবাস উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও সরাসরি সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
দেশের প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় উড়োজাহাজ কেনা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের দেশের বোয়িংও প্রয়োজন, এয়ারবাসও প্রয়োজন। আমরা দুটিই কিনব।”
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আগের সরকারগুলোর কাছ থেকে একটি দুর্বল অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন। অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে একদিকে যেমন সাশ্রয়ী নীতি অনুসরণ করতে হবে, অন্যদিকে দেশের প্রয়োজনীয় জিনিসও কিনতে হবে। আমাদের বোয়িংও দরকার, এয়ারবাসও দরকার। আমরা দুটিই কিনব।”
শামা আরও বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট দেশকে অগ্রাধিকার দেবে না। “বিনিয়োগের প্রশ্নে বাংলাদেশের স্বার্থই সবসময় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।”
বাণিজ্যিক কৌশল গুরুত্বপূর্ণ
যদিও বহরে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে নতুন সুযোগ তৈরি হবে, তবে বিমান বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্প্রসারণের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ রুট নেটওয়ার্কের সঙ্গে উড়োজাহাজগুলো কতটা কার্যকরভাবে সামঞ্জস্য করা যায় তার ওপর।
বিমান বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, মিশ্র বহর দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক দক্ষতা বাড়াতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “অবশ্যই স্পষ্ট রুট পরিকল্পনা এবং লাভজনকতার কৌশল থাকতে হবে।”
নজরুল বলেন, “মিশ্র বহর থাকলে যাত্রী চাহিদা, রুটের কার্যকারিতা এবং ব্যয় কাঠামোর ভিত্তিতে সবচেয়ে উপযুক্ত উড়োজাহাজ ব্যবহার করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের উড়োজাহাজ ব্যবহারের মাধ্যমে রুট পরিচালনার অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয় এবং পরিচালন ব্যয় কমে।”
তাই বিমানের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহ নয়। সংস্থাটির সাফল্য নির্ভর করবে বাণিজ্যিকভাবে টেকসই রুট গড়ে তোলা, উড়োজাহাজের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো, পর্যাপ্ত কারিগরি ও মানবসম্পদ তৈরি করার মাধ্যমে। দুই নির্মাতার উড়োজাহাজকে এমনভাবে একীভূত করতে হবে যাতে বহর ব্যবস্থাপনার অতিরিক্ত জটিলতা সম্ভাব্য সুফলকে নষ্ট না করে।