তিন মাস পর খুলল সুন্দরবনের দুয়ার
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Tuesday, September 01, 2026
মাছের প্রজনন মৌসুমকে সামনে রেখে দেওয়া তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে সুন্দরবনের সব নদ-নদীতে মাছ আহরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে বাদাবন—খুলে যাচ্ছে পর্যটক, জেলে ও বনজীবীদের জন্য সুন্দরবনের দুয়ার।
নিষেধাজ্ঞার তিন মাস অলস পড়ে ছিল মাছ ধরার নৌকাগুলো। সেই বিরতি ভেঙে এখন নদীর পাড়ে সাজ সাজ রব। কারও নৌকায় চলছে কাঠের পাটাতন মেরামত, কেউ ব্যস্ত তলায় নতুন করে আলকাতরা লাগাতে, কেউবা গোছাচ্ছেন জাল আর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম—সব মিলিয়ে সুন্দরবনযাত্রার প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে।
চলতি বছরের জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনের সব নদ-নদী ও খালে মাছ ধরা এবং বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ ছিল। একই সময় করমজল ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র বাদে সুন্দরবনের অন্য সব পর্যটনকেন্দ্রেও পর্যটকদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। তিন মাস কর্মহীন থাকার পর নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় বনজীবীদের মধ্যে তাই ফিরেছে নতুন কর্মচাঞ্চল্য।
এখন থেকে পাস-পারমিট নিয়ে বনজ সম্পদ আহরণের জন্য বনে প্রবেশ করতে পারবেন বনজীবীরা। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে কটকা, কচিখালী, হারবাড়িয়া, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর, নীলকমলসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র।
একদিনের সুন্দরবন ভ্রমণে পর্যটকদের কাছে মোংলার অদূরে করমজল ও হারবাড়িয়া অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। খুলনা থেকেও সুন্দরবনের কয়েকটি এলাকায় যাওয়া যায়—নদীপথে বা সড়কপথে কালাবগী গিয়ে সেখান থেকে ট্রলারে শেখেরটেক যাওয়ার সুযোগ আছে। আবার সাতক্ষীরা হয়ে সুন্দরবনে ঢুকতে চাইলে সেখান থেকে নৌযানে যাওয়া যায় কলাগাছিয়া বা দুবেকীতে। তবে হারবাড়িয়া, শেখেরটেক ও দুবেকী যেতে লাগে বন বিভাগের বিশেষ অনুমতি।
আজ থেকে নদীতে নামছে জেলেদের নৌকা, বনে ফিরছেন বনজীবীরা, আর সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগে ছুটে আসছেন পর্যটকরা। তিন মাসের নীরবতা ভেঙে ফের সজীব হয়ে উঠছে নদীপথ ও পুরো সুন্দরবন।
সুন্দরবন করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে করমজল স্পটে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ ফুটট্রেইল নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া একটি ঝুলন্ত ব্রিজ ও একটি আরসিসি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং পর্যটকদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে করমজলে গড়ে তোলা হয়েছে একটি ইনফরমেশন সেন্টার।
তিনি বলেন, তিন মাস বন্ধ থাকার পর সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীর ভিড় বাড়বে বলে আমরা আশা করছি। পর্যটকদের নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ দিতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটকরা সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবেন। একই সঙ্গে বনজ সম্পদ আহরণের জন্য পাস-পারমিট নিয়ে বনজীবীরাও বনে প্রবেশ করতে পারবেন।
সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো ঘোষিত একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত এই বনের সিংহভাগই পড়েছে বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায়।
বিরল প্রজাতির রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হিসেবে সুন্দরবন সবচেয়ে বেশি পরিচিত হলেও এখানে রয়েছে হরিণ, কুমির, বানরসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী এবং শতাধিক প্রজাতির মাছ ও পাখি। জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকাকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা করার প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেও সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রতি বছর মাছের প্রজনন মৌসুমে—সাধারণত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত—বন বিভাগ সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ ধরা, বনজ সম্পদ আহরণ ও পর্যটনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যাতে মাছসহ জলজ প্রাণীর প্রজনন প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হতে পারে। সূত্র: বাসস