বহর সম্প্রসারণ কৌশল পুনর্বিবেচনায় বাংলাদেশ: এয়ারবাসের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার
বিমানের ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তির পর ইউরোপের সক্রিয়তা বেড়েছে; বাংলাদেশের সম্প্রসারণশীল বিমানবাজারে আধিপত্য বিস্তারে নতুন করে মুখোমুখি বিশ্বের দুই শীর্ষ উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস ও বোয়িং।
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের প্রতিযোগিতা নতুন মোড় নিয়েছে। জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভবিষ্যৎ বহর কেমন হবে, তা নিয়ে যখন সরকার নতুন করে ভাবছে, তখন ইউরোপীয় দেশগুলো এয়ারবাসের পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তাগুলোর একটি ছিল ১৫ জুলাই অনুষ্ঠিত এক যৌথ বৈঠক। ওই বৈঠকে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম এবং প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল বিমানের বহর সম্প্রসারণ।
এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো এমন এক সময়ে, যখন মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বহু প্রতীক্ষিত চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। এটি সংস্থাটির ইতিহাসের অন্যতম বড় বহর সম্প্রসারণ উদ্যোগ।
এই চুক্তির মাধ্যমে বিমানের বহরে বোয়িংয়ের দীর্ঘদিনের প্রাধান্য আরও দৃঢ় হলেও সাম্প্রতিক আলোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার পরবর্তী সম্প্রসারণে এয়ারবাসকে জায়গা করে দিতে ইউরোপ সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি টেকসই মিশ্র বহর গড়ে তুলতে বাংলাদেশ এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জবাবে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
শুধু উড়োজাহাজ বিক্রি লক্ষ্য নয়
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই বৈঠক কেবল বাণিজ্যিক আলোচনা নয়; এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কূটনীতি।
বর্তমানে উড়োজাহাজ কেনাবেচা শুধু একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাণিজ্য, শিল্প সহযোগিতা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এয়ারবাসের জন্য বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার হাতে গোনা কয়েকটি সম্ভাবনাময় বাজারের একটি, যেখানে এখনো বড় ধরনের প্রবেশ সম্ভব। অন্যদিকে ইউরোপের দৃষ্টিতে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে এয়ারবাসের অর্ডার পাওয়া শুধু বহরে বৈচিত্র্যই আনবে না, বরং বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও আরও গভীর করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, একই বৈঠকে পাঁচটি ইউরোপীয় অংশীদারের কূটনীতিকদের উপস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়, এয়ারবাসের প্রচারণা এখন করপোরেট বিপণনের গণ্ডি পেরিয়ে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
মিশ্র বহর, নাকি পরিচালনায় নতুন জটিলতা?
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দীর্ঘদিন ধরেই জেট উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে পুরোপুরি বোয়িংনির্ভর বহর পরিচালনা করে আসছে। এর ফলে পাইলট প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশের মজুত এবং প্রকৌশল সহায়তা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে।
তবে এয়ারবাস যুক্ত হলে বিমানকে মিশ্র বহর পরিচালনা করতে হবে। বিশ্বের অনেক সফল এয়ারলাইন্স এ ধরনের বহর পরিচালনা করলেও এর জন্য পাইলট রূপান্তর প্রশিক্ষণ, প্রকৌশল সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালন পরিকল্পনায় অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।
তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মিশ্র বহর থাকলে উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে নমনীয়তা বাড়ে, নির্মাতাদের সঙ্গে দর-কষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীলতা কমে।
এছাড়া বিভিন্ন রুটে ভিন্ন ধরনের উড়োজাহাজের কার্যকারিতা তুলনা করার সুযোগ তৈরি হয় এবং নির্মাতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ায় ক্রেতারা আরও ভালো দাম ও সুবিধা আদায় করতে পারেন।
প্রতিযোগিতা থাকলে সুবিধা পায় ক্রেতারা
বোয়িং ও এয়ারবাসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অতীতেও বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সকে বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা এনে দিয়েছে।
গ্রাহক টানতে দুই প্রতিষ্ঠানই মূল্যছাড়, সহজ অর্থায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং শিল্প সহযোগিতার মতো আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিয়ে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় শক্তিশালী দর-কষাকষির অবস্থানে রয়েছে।
বিমান ইতোমধ্যে ১৪টি বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার বহরে দীর্ঘমেয়াদি জায়গা করে নিতে চাইলে এয়ারবাসকে এখন আরও আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাব দিতে হবে।
বহর কৌশলের প্রভাব আরও বিস্তৃত
বহর সম্প্রসারণের প্রভাব শুধু উড়োজাহাজ কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, পাইলট প্রশিক্ষণ, প্রকৌশল খাতে কর্মসংস্থান, বিমানবন্দর অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী এক দশকে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করার সরকারি লক্ষ্য বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে বহর বাড়ানোর প্রয়োজন হবে। ফলে ভবিষ্যতের উড়োজাহাজ ক্রয়ের সিদ্ধান্ত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপের বার্তা
১৫ জুলাইয়ের বৈঠকে কোনো উড়োজাহাজ ক্রয়ের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না এলেও ইউরোপের বার্তা ছিল স্পষ্ট। এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে বৃহত্তর বিমান পরিবহন সহযোগিতা জোরদারের আশ্বাস দিয়েছেন ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো—কোনো নির্দিষ্ট নির্মাতাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়পরিবেশ বজায় রাখা, যাতে জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে এয়ারবাসের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, শুধুমাত্র বোয়িংনির্ভর বহর বজায় রাখার চেয়ে মিশ্র বহর দীর্ঘমেয়াদে কেন বেশি লাভজনক—তা ঢাকাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যখন বহর সম্প্রসারণের নতুন অধ্যায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বিশ্বের দুই বৃহত্তম উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। আগামী কয়েক মাসেই স্পষ্ট হবে, ইউরোপের কূটনৈতিক উদ্যোগের ফল হিসেবে প্রথমবারের মতো বিমানের বহরে এয়ারবাস যুক্ত হয়, নাকি বাংলাদেশের আকাশে বোয়িংয়ের দীর্ঘদিনের আধিপত্যই বহাল থাকে।