বিশ্বের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং পাঁচ বিমানবন্দর: যেখানে নামতে পারেন শুধু অভিজ্ঞ পাইলটরা
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Sunday, June 07, 2026
-কোলাজ ছবি
আকাশপথে ভ্রমণের শেষ কয়েক মিনিটই একজন পাইলটের দক্ষতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বিমান অবতরণকে ধরা হয় ফ্লাইট পরিচালনার সবচেয়ে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। কিন্তু পৃথিবীর কিছু বিমানবন্দর এই চ্যালেঞ্জকে নিয়ে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাত্রায়। কোথাও পাহাড়ঘেরা সরু উপত্যকার ভেতর দিয়ে বিমান নামাতে হয়, কোথাও রানওয়ে এতটাই ছোট যে সামান্য ভুলের সুযোগও নেই। কোথাও আবার প্রবল ও অনিয়মিত বায়ুপ্রবাহ কিংবা অস্বাভাবিক খাড়া অবতরণ কোণ পাইলটদের প্রতিটি মুহূর্ত সতর্ক রাখে।
এসব বিমানবন্দরে অবতরণ ও উড্ডয়নের অনুমতি পেতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অতিরিক্ত দক্ষতার প্রয়োজন হয়। বিশ্বের এমন কয়েকটি বিমানবন্দর রয়েছে, যেগুলোকে বিমান চলাচলের সবচেয়ে কঠিন ও ভয়ঙ্কর গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অ্যাসপেন-পিটকিন কাউন্টি বিমানবন্দর
কলোরাডো, যুক্তরাষ্ট্র
উত্তর আমেরিকার বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে সবচেয়ে কঠিন বিমানবন্দর হিসেবে পাইলটরা একবাক্যে এই নামটিই বলেন। কলোরাডোর অ্যাসপেন শহরের এই বিমানবন্দরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭,৮২০ ফুট উচ্চতায় একটি পার্বত্য উপত্যকায় অবস্থিত। চারদিকে ১৪,০০০ ফুট উঁচু পাহাড়।
অ্যাসপেনের বিশেষত্ব হলো এর অনন্য ট্রাফিক পদ্ধতি, যা পৃথিবীর আর কোনো বাণিজ্যিক বিমানবন্দরে নেই। দক্ষিণে পাহাড় থাকায় বিমানকে রানওয়ে ১৫ দিয়ে নামতে হয়, আর রানওয়ে ৩৩ দিয়ে উড়তে হয় — অর্থাৎ একই রানওয়েতে বিপরীত দিকে চলাচল।
মার্কিন ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) এখানে উড়তে আলাদা সনদ বাধ্যতামূলক করেছে। ২০২৫ সালের হিসাবে শুধু স্কাইওয়েস্ট এয়ারলাইন্সের পাইলটরাই এখানে ফ্লাইট পরিচালনার ছাড়পত্র রাখেন।
লন্ডন সিটি বিমানবন্দর
যুক্তরাজ্য
পশ্চিম ইউরোপের ঘন নগর আকাশপথে এটি সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিমানবন্দর। ক্যানারি ওয়ার্ফের সুউচ্চ ভবন এবং লন্ডনের স্কাইলাইনের পাশ ঘেঁষে থাকায় বিমানকে এখানে ৫.৫ ডিগ্রি কোণে নামতে হয় — যা আন্তর্জাতিক স্বাভাবিক মান ৩ ডিগ্রির প্রায় দ্বিগুণ। রানওয়ের দৈর্ঘ্য মাত্র ১,৫০৮ মিটার, যা বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তুলনায় অনেক কম।
৪.৫ ডিগ্রির বেশি কোণকে কর্তৃপক্ষ 'খাড়া অবতরণ' বলে চিহ্নিত করে এবং এর জন্য আলাদা অনুমোদন দরকার হয়। কোনো পাইলট প্রথমবার লন্ডন সিটিতে নামার সময় আইএলএস অ্যাপ্রোচ ও গো-অ্যারাউন্ড করতে বাধ্য এবং কমপক্ষে ৩,০০০ মিটার দৃশ্যমানতা থাকতে হবে। বর্তমানে শুধু ইমব্রায়ার ই১৯০ ও ই১৯৫-ই২ মডেলের বিমান এখানে চলতে পারে।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
মাদেইরা, পর্তুগাল
ইউরোপের সবচেয়ে কঠিন 'ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাপ্রোচ' হিসেবে খ্যাত মাদেইরা বিমানবন্দর। রানওয়ে ২৩ দিয়ে স্বাভাবিক আইএলএস পদ্ধতিতে নামা গেলেও রানওয়ে ০৫-এ সরাসরি অবতরণ সম্ভব নয় পাহাড়ের কারণে। পাইলটকে শেষ মুহূর্তে ১৮০ ডিগ্রি মোড় নিয়ে নামতে হয়, আর এক পাশে আটলান্টিক মহাসাগর, অন্য পাশে পাহাড়।
পর্তুগাল সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ মাদেইরাকে ক্যাটাগরি সি মানের বিমানবন্দর ঘোষণা করেছে। পাইলটদের বিশেষ সিমুলেটর প্রশিক্ষণ নিতে হয় এবং সনদ পাওয়ার আগে জাম্পসিটে বসে একাধিক ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ করতে হয়। এখানে বায়ুর বেগ নিরাপদ সীমার মাত্র ৩ নট ছাড়িয়ে গেলেই ৮০ শতাংশ ফ্লাইট বিকল্প গন্তব্যে সরিয়ে নিতে হয়।
২০২৪ সালের শেষ দিকে উন্নত রাডার ব্যবস্থা স্থাপনের পর অপ্রয়োজনীয় ডাইভার্সন কিছুটা কমেছে। রানওয়ের একটি অংশ সমুদ্রের উপর ১৮০টি কংক্রিট পিলারের উপর নির্মিত, যা ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক কাঠামো প্রকৌশল পুরস্কার পেয়েছিল।
তেনজিং-হিলারি বিমানবন্দর
লুকলা, নেপাল
এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের প্রবেশদ্বার লুকলা- সামগ্রিক দুর্ঘটনা, ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এবং মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিবেচনা করে লুকলা বিমানবন্দরকেই বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর রানওয়ে হিসেবে এক নম্বরে রাখা হয়।
৫২৭ মিটার দীর্ঘ এই রানওয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক বিমানবন্দরের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯,৩৩৪ ফুট উচ্চতায় থাকায় ইঞ্জিন ও ডানার কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
উত্তর প্রান্তে পাহাড়, দক্ষিণে খাড়া খাদ — ফলে নামার শেষ মুহূর্তে কোনো সমস্যা হলে আবার ওপরে ওঠার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। কোনো আইএলএস নেই, রাডার নেই। পাইলটকে পুরোপুরি দৃষ্টির উপর নির্ভর করে উড়তে হয়।
নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিধান অনুযায়ী, এখানে উড়তে হলে পাইলটকে কমপক্ষে ১০০টি শর্ট টেকঅফ-ল্যান্ডিং (স্টল) ফ্লাইট সম্পন্ন করতে হবে, নেপালে এক বছরের স্টল অভিজ্ঞতা এবং একজন প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে লুকলায় দশটি ফ্লাইট করতে হবে। ডিএইচসি-৬ টুইন অটার ও ডর্নিয়ার ২২৮ — এই দুটি মডেলই মূলত এখানে চলাচল করে।
পারো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
ভুটান
পৃথিবীর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বাণিজ্যিক বিমানবন্দর হিসেবে পাইলটরা সবার আগে যে নামটি বলেন, সেটি ভুটানের পারো। হিমালয়ের গভীর উপত্যকায় ৭,৩৩২ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই বিমানবন্দরের চারদিকে ১৮,০০০ ফুট উঁচু পাহাড়। ৭,৪৩১ ফুট দীর্ঘ রানওয়েটি দেখা যায় মাত্র এক থেকে দুই নটিক্যাল মাইল দূর থেকে, অথচ সাধারণত ১০ মাইল আগে থেকেই রানওয়ে দৃশ্যমান হওয়া উচিত।
এখানে কোনো রাডার নেই। পাইলটকে উপত্যকার আঁকাবাঁকা পথ ধরে সম্পূর্ণ দৃষ্টির উপর নির্ভর করে উড়তে হয়, বিশেষ ভৌগোলিক চিহ্ন ব্যবহার করে পথ নির্ণয় করতে হয়। রাতে বা কম দৃশ্যমানতায় অবতরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মৌসুমি বায়ু ও পাহাড়ি বায়ুপ্রবাহের কারণে জুন থেকে আগস্টে অপারেশন বন্ধ রাখতে হয়। তাপমাত্রা ও বায়ু তুলনামূলক অনুকূল থাকায় দুপুরের আগেই সব অবতরণ শেষ করার চেষ্টা করা হয়।
পারোর সনদ পেতে হলে পাইলটকে কমপক্ষে ১,৫০০ ঘণ্টার মোট উড়ানের অভিজ্ঞতা, এয়ারলাইন ট্রান্সপোর্ট পাইলট সনদ এবং ৫০০ ঘণ্টার পর্বত উড়ানের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এরপর নিবিড় সিমুলেটর প্রশিক্ষণ এবং তত্ত্বাবধানে কমপক্ষে ৩০টি টেকঅফ-ল্যান্ডিং সম্পন্ন করতে হবে। বর্তমানে পৃথিবীতে মাত্র প্রায় ৫০ জন পাইলটের পারো সনদ রয়েছে। ড্রুকএয়ার ও ভুটান এয়ারলাইন্স — এই দুটি সংস্থাই কেবল এখানে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারে।
সূত্র: সিম্পল ফ্লাইং