দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের ৪৪৭ ফ্লাইট বাতিল; পরিচালিত ৪৪৮ ফ্লাইটের পর্যাপ্ততা কেমন?
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Friday, March 13, 2026
ফাইল ছবি
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই সপ্তাহে মোট ৪৪৭টি মধ্যপ্রাচ্যের ফ্লাইট বাতিল হলেও একই সময়ে বিমানবন্দর থেকে ৪৪৮টি মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইট সফলভাবে পরিচালনা করা হয়েছে বিধায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আছে। এই দুই মেরুর সংখ্যা কাছাকাছি হওয়ায় বিমানবন্দর এখন পরিণত হয়েছে পরিসংখ্যানগত বিপর্যয়ের কেন্দ্রে।
ফ্লাইট পরিচালনায় বিভাজন, স্থিতিশীল রুট
অস্থিতিশীলতার মাঝেও উপাত্ত বিশ্লেষণ করা দেখা যায় যে মধ্যপ্রাচ্যে আকাশ সংযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মার্চের মধ্যে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সফলভাবে ৪৪৮টি ফ্লাইট ঐ অঞ্চলে পরিচালনা করা হয়েছে। এতে করে বিশেষ কিছু রুটের স্থিতিস্থাপকতা এবং সংকটকালে এভিয়েশন খাতের চাপ মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বুঝা গেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সৌদি আরব। শুধু ঐ দেশেই এককভাবে ২১৯ ফ্লাইট পরিচালিত হয়। এর পরের দুই নিরাপদ গন্তব্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান। ঐ দুই দেশে যথাক্রমে ১১৮ টি ও ১১১ টি ফ্লাইট পরিচালিত হয়।
চলতি মাসের ১২ তারিখে ৪৮ টি ফ্লাইট পরিচালিত হওয়ায় বুঝা গেছে যে দুই সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ফ্লাইট ঐ দিনই পরিচালিত হয়। পরদিন সংখ্যায় কমিয়ে ৩৭টি ফ্লাইট পরিচালনা করে ঢাকা বিমানবন্দর।
নির্দিষ্ট আকাশসীমা দ্রুত পুনরায় খোলার কারণে এতো সংখ্যক ফ্লাইট সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরব ও ওমানসহ মধ্যেপ্রাচ্যের ৭টি দেশ একযোগে আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা দিলেও খুব অল্প সময়ের ব্যবধান ঐ দুই দেশ পুনরায় ঢাকাতে ফ্লাইট চলাচল সুবিধা চালু করে।
এই সুযোগ লুফে নেয় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। তারা শারজাহ এবং আবুধাবি ফ্লাইট পুনরায় চালু করার ঘোষণা দেয়। পাশপাশি দৈনিক ডুবাই, জেদ্দা ও রিয়াধে ফ্লাইট পরিষেবা চালু রাখে। দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সব অঞ্চলে সংকট প্রকট হয়নি। তাই নিরাপদ গন্তব্যে বেশি বেশি ফ্লাইট পরিচালিত হয়।
৪৪৭ ফ্লাইট বাতিলে ভোগান্তিতে যাত্রীরা
অপরদিকে, মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইট পরিচালনা এবং বাতিলকরণের মাঝে রয়ে গেছে বিশাল ফাঁক। আপাত দৃষ্টিতে দুই সপ্তাহে ৪৪৮ টি ফ্লাইট ঢাকা বিমানবন্দর থেকে পরিচালিত হলেও একই সময়ে ৪৪৭ ফ্লাইট বাতিল করা হয়। ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কারণে মধ্যেপ্রাচ্যের ৭টি রুটে বিপুল সংখ্যক যাত্রীদেরকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার এবং জর্ডান তাদের আকাশপথ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ঘোষণা দিলে মধ্যেপ্রাচ্যগামী ফ্লাইট সংকট শুরু হয়। মার্চের ২ তারিখ ৪৬ টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়, যা এখন পর্যন্ত বাতিল ফ্লাইটের সর্বোচ্চ সংখ্যা।
প্রথম সপ্তাহে দৈনিক বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা ২৪-৪৬ এর মধ্যেই উঠানামা করেছে।
শীর্ষ ফ্লাইট বাতিলের দিনগুলোর বিবরণে গালফ এয়ারলাইন্সের বিধ্বংসী পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কেবল ৫ মার্চেই, কাতার এয়ারওয়েজ ও এমিরেটস ৪ টি করে ফ্লাইট বাতিল করেছে। আর শারজাহভিত্তিক এয়ার আরবিয়া ১০টি ফ্লাইট বাতিল করে তালিকায় শীর্ষে আছে। ১২ মার্চ পর্যন্ত মোট বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা ৪২৩-এ থাকলেও শুক্রবার দুই সপ্তাহের বাতিল ফ্লাইটের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৪৭-এ।
পর্যাপ্ততা বনাম অপর্যাপ্ততা
ফ্লাইট পরিচালনা ও বাতিলকরণের সংখ্যা একত্র করলে এয়ারলাইন ও বিমানবন্দরের প্রতিক্রিয়া স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
‘খোলা’ রুটে সক্ষমতা যথেষ্ট
যেসকল রুটে আকাশপথ উন্মুক্ত ছিল সেগুলোত নির্দিষ্ট ফ্লাইটসূচি মেনে এয়ারলাইনগুলো তাদের সক্ষমতা দক্ষভাবে ব্যবহার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই দুই সপ্তাহে গড়ে দৈনিক ৩২টি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। সৌদি আরবে দৈনিক ১৩-২৩ টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। বুঝা গেছে, বৃহৎ সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক নির্ভর রুটগুলো কার্যকরভাবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। তাছাড়া এই সপ্তাহেই ইউ-এস বাংলা এয়ারলাইন্স সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ এবং আবুধাবির মতো প্রভাবিত রুটগুলোতে পুনরায় ফ্লাইট চালুর তারিখ দ্রুত ঘোষণা দিতে যাচ্ছে।
‘বন্ধ’ রুটের জন্য অপ্রতুল প্রতিকার
কিন্তু ৭টি দেশের আকাশসীমা বন্ধ হওয়ায় এয়ারলাইনগুলো যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। ঢাকা বিমানবন্দরের ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা থেকে প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করে বুঝা গেছে যে যাত্রীদের রীতিমতো বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পুনরায় ফ্লাইট চালু করার কোনো নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি। দুবাই ও আবুধাবির মতো বড় বড় এভিয়েশন হাবে মার্চের ১০ তারিখ পর্যন্ত ফ্লাইট চলাচল বন্ধ ছিল।
ফলে এয়ারপোর্টেই কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শত শত যাত্রী আটকে আছেন। এতদিন ধরে বাংলাদেশ থেকে এই দুই রুটে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালিত হয়ে আসার কারণে বিকল্প ব্যবস্থাও ছিল না।
মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
এই দ্বৈত বাস্তবতা জটিল প্রভাব তৈরি করেছে।
প্রবাসী শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতি
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতির মূল ভিত্তি বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের উপর। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং কুয়েত ফ্লাইট বন্ধ থাকায় চুক্তিভিত্তিক বা জরুরি ছুটিতে দেশে এসে এখন আটকা পড়া শ্রমিকদের এখন চাকরি হারানোর ঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতি বহন করেই দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। হঠাৎ এতো সংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কারণে শত শত যাত্রী বিমানবন্দরে আটকে গেছে। প্রতিদিনের থাকা-খাওয়ার পেছনের মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
এয়ারলাইনের ক্ষতি
এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ ও কুয়েত এয়ারওয়েজের মতো গালফ অঞ্চলের এয়ারলাইনগুলো ঢাকা থেকে দৈনিক অনেকগুলো ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজে ফ্লাইট পরিচালনা করে। তাদের ফ্লাইট স্থগিত রাখা হলে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি হয়ে যাবে। ঢাকা তাদের নেটওয়ার্কের ব্যস্ততম রুটগুলোর মধ্যে একটি। দুই সপ্তাহের এই দীর্ঘ বিরতি এয়ারলাইনগুলোর আর্থিক হিসেবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মার্কেট শেয়ারের পরিবর্তন
এই সংকট এভিয়েশন খাতের প্রতিযোগিতার চিত্র বদলে দিচ্ছে। সতর্ক অবস্থান নেওয়ায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের (বিমান) দোহা, শারজাহ ও কুয়েত রুট বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে ইউএস-বাংলা আবার এসব রুটে ফ্লাইট চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। আকাশপথ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে ভবিষ্যতে যাত্রীদের একটি অংশ গালফ অঞ্চলের এয়ারলাইনগুলোর বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব, ওমান বা তুর্কির এয়ারলাইনগুলোর কানেক্টিং ফ্লাইট বেছে নিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট যাত্রীদের আস্থাও ক্ষয় করছে। বিমান ইতিমধ্যে জানায় যে বাতিল ফ্লাইটের যাত্রীরা যাত্রার তারিখ পরিবর্তন করতে পারবে বা টিকিটের মূল্য ফেরত নিতে পারবে।
তবে যুদ্ধ কিংনা সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেও এয়ারলাইনগুলো কেন যেনো যাত্রীদের ক্ষতিপূরণ দিতে চায় না। বিপদে যাত্রীদের অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু ন্যূনতম সেবা দিয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদে যেকোনো ব্র্যান্ডই গ্রাহকের আস্থা হারিয়ে ফেলে।