তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে বাংলাদেশ-জাপান আলোচনায় সরকার আশাবাদী
উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ২১,৩৯৮ কোটি টাকার বিমানবন্দর সুবিধা চালু করার জন্য উভয়পক্ষের জন্যই লাভজনক সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা চলছে
সিনিয়র প্রতিবেদক
| Published: Friday, March 13, 2026
ছবি: সংগৃহীত
বহুল প্রত্যাশিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালটি কার্যকর করতে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে পুনরায় জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু হলো।
শুক্রবার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে পুনরায় আলোচনার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চ-স্তরের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা জানান, আলোচনার লক্ষ্য হচ্ছে উভয়পক্ষের জন্য লাভজনক সমাধানের পথ খুঁজে বের করে টার্মিনালটি যত দ্রুত সম্ভব চালু করা।
বৈঠকের পর অ্যাভিয়েশন এক্সপ্রেসকে রিতা বলেন, “আমাদের বৈঠক সুষ্ঠু হয়েছে। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশ অনুযায়ী তৃতীয় টার্মিনালটি যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর করার চেষ্টা করছি। আমরা আশা করি আলোচনা করে জাপান ও বাংলাদেশ উভয়পক্ষের জন্যই লাভজনক চুক্তির পথ বের করতে পারবো।”
বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বেসামরিক বিমান মন্ত্রী রীতা, প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বিমান প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ ইসলাম।
জাপানের প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে জাপানের দূতাবাসের চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স তাকাহাশি নাওকি এবং জাপানের মিনিস্ট্রি অফ ল্যান্ড, ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ট্যুরিজম-এর সহকারী ভাইস মিনিস্টার রিয়েকো নাকায়ামা সহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ।
আলোচনায় বিমানবন্দরে যাত্রীদের ওঠানামার ফি (এমবার্কেশন ফি), আয়-বন্টন এবং টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা বা অন্যান্য সুবিধা চালুর জন্য অগ্রিম ফি (আপফ্রন্ট ফি)-এর মতো অর্থনৈতিক বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত ও হুমায়ুন কবির আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেন।
আশাবাদ ব্যক্ত করে মিল্লাত বলেন, শীঘ্রই একটি পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে। উভয় পক্ষই এমন ব্যবস্থা চাইছে যা বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক হবে এবং আগের চুক্তিতে থাকা ঘাটতিগুলো সংশোধন করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা চুক্তিতে নির্দিষ্ট চার্জ এবং কার্যকরী বিষয় নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। বেসামরিক বিমান চুক্তিতে সাধারণত তিন ধরনের চার্জ থাকে, এবং কিছু বিষয় নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়ে গেছে।
মিল্লাত বলেন, “উভয় পক্ষ এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। বাংলাদেশ তার প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে এবং জাপানি পক্ষও তাদের অবস্থান শেয়ার করেছে।”
জাপানি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করবে এবং শীঘ্রই সংশোধিত প্রস্তাব জমা দেবে। এরপর আরও আলোচনা করে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকার জাতীয় স্বার্থকে ‘সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে’ বিষয়গুলো যাচাই করছে বলে নিশ্চিত করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, “দুই পক্ষের আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে, এবং আশা করি, শীঘ্রই এর ফলে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।”
তিনি জানান যে চলতি মাসের শেষের দিকে পরবর্তী সভা আয়োজনের সময় নির্ধারণ করা নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
টার্মিনালের কাজ প্রায় ৯৯ শতাংশ শেষ হয়ে গেলেও এখনো চালু করা হয়নি। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, চালু করতে দেরী হওয়ার মূল কারণ হলো অন্তবর্তী সরকারের সময় টার্মিনাল পরিচালনা, কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং আয়-বণ্টন নিয়ে জাপানি পক্ষের সাথে আলোচনায় একমত না হওয়া।
এই জাপানি কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো কর্পোরেশন, সোজিৎস কর্পোরেশন, এবং নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্পোরেশন। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) মূলত এই প্রকল্পের অর্থায়ন করেছে।
২০১৭ সালে অনুমোদন পাওয়া এই টার্মিনালটি ২০১৯ সালে প্রায় ২১,৩৯৮ কোটি টাকা খরচে উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই টার্মিনাল। প্রতি বছর ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী এবং প্রায় ৯ লাখ টন কার্গো পরিচালনার জন্য টার্মিনালের ডিজাইন করা হয়েছে।
এভিয়েশন শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই টার্মিনাল চালু হলে যেমনি ঢাকা বিমানবন্দরের ভিড় কমবে তেমনি বাংলাদেশও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন হাবে পরিণত হবে। কিন্তু অনেক টাকা বিনিয়োগ করে টার্মিনালের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ করা হলেও এখনো এখান থেকে কোনো সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।
পূর্বে আন্তর্জাতিক বিবাদ নিষ্পত্তি বোর্ড অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামকে দিয়ে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ করানোর জন্য বেবিচককে ৩,০০০ কোটি টাকার বেশি পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে নির্দেশ দেয়। ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারি, প্রকল্প সম্পন্ন করলেও কোভিড-১৯ মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক সংকট চলায় চুক্তির শর্ত থাকা সত্ত্বেও কনসোর্টিয়ামের পাওনা টাকা বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হয় বেবিচক।