দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত, আগস্টের শেষ সপ্তাহে কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
| Published: Thursday, July 30, 2026
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করতে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় যাওয়া শুরু হবে।
বৃহস্পতিবার (স্থানীয় সময়) বিকেল ৩টায় কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, "আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই, দুই দেশই অবিলম্বে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। একটি নতুন ও আধুনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার চালু করা হবে, যাতে বাংলাদেশের বিপুল জনশক্তির জন্য মালয়েশিয়ার দুয়ার আবার খুলে যায়।"
তিনি জানান, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সব খাতের বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়ে যৌথ সিদ্ধান্ত হয়েছে। দুই দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
"আমাদের লক্ষ্য, আগামী আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় যাওয়া শুরু হবে," বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি আর. রামানান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, তাদের আন্তরিক সহযোগিতার কারণেই শ্রমবাজার পুনরায় চালুর এ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, "সবার আগে বাংলাদেশ" নীতিকে সামনে রেখে দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে কর্মী যাওয়া শুরু হলে তা দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের জীবনমান উন্নয়ন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
দেশবাসীর উদ্দেশে মাহ্দী আমিন বলেন, শ্রমবাজার খুলে যাওয়ায় সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং শুধুমাত্র সরকারি ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। কোনোভাবেই দালাল বা প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়া যাবে না।
তিনি জানান, দেশে ফিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে, যাতে কেউ প্রতারণার শিকার না হন।
মাহ্দী আমিন বলেন, খুব শিগগিরই বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের কাজ শুরু হবে। বাংলাদেশ হাইকমিশন ও মালয়েশিয়ান হাইকমিশন যৌথভাবে এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে কাজ করবে।
তিনি আরও জানান, প্রথম ধাপে কর্মী নিয়োগে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য মালয়েশিয়া সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
অভিবাসন ব্যয় কমানো, দক্ষ জনশক্তি পাঠানো এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির কথা উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর সমঝোতা স্মারকের আওতায় মালয়েশিয়া নিজস্ব যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত এজেন্সির সংখ্যা নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ সর্বোচ্চসংখ্যক যোগ্য এজেন্সিকে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছে।
তিনি বলেন, বিগত সময়ে দুর্নীতি, সিন্ডিকেট ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের নতুন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। ইতোমধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো নিয়মতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুততম সময়ে কম খরচে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানো।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক এখন কেবল শ্রমবাজারেই সীমাবদ্ধ নয়; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জ্বালানি খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
শ্রমবাজার বন্ধ থাকার কারণ সম্পর্কে মাহ্দী আমিন বলেন, বিগত সরকারের সময় অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে বাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তা চালুর উদ্যোগ নিলেও নানা জটিলতায় সফল হয়নি। তবে বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই অবশেষে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর পথ তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, গত দুই দিনে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তাদের শুক্রবার ভোরে ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরীসহ হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।