কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে বিমানের একচেটিয়া আধিপত্যই থাকছে
তৃতীয় টার্মিনালে দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়ে আগের অবস্থান থেকে সরে এলো বেবিচক
সিনিয়র প্রতিবেদক
| Published: Tuesday, June 16, 2026
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের একমাত্র দায়িত্ব বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছেই রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এর ফলে বিমানবন্দরটির অন্যতম লাভজনক এই খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিমানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকছে।
এর আগে বেবিচক জানিয়েছিল, তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাওয়া জাপানি কনসোর্টিয়াম চাইলে একটি দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগ দিতে পারবে। তবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দ্বিতীয় কোনো অপারেটর এলেও তারা শুধু যাত্রীসেবা ও সংশ্লিষ্ট গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকবে; কার্গো পরিচালনা থাকবে বিমানের অধীনেই।
বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এভিয়েশন এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, “দ্বিতীয় হ্যান্ডলার নিয়োগ করা হলেও তাদের কাজ যাত্রী ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মধ্যে সীমিত থাকবে। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব পুরোপুরি বিমানের কাছেই থাকবে।”
প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত
বেবিচকের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের ফলে তৃতীয় টার্মিনালে প্রতিযোগিতার পরিধি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলোর প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে পরিচালনাকারী বিদেশি এয়ারলাইনগুলো দীর্ঘদিন ধরে একাধিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার চালুর দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি, একাধিক অপারেটর থাকলে সেবার মান বাড়বে, উড়োজাহাজের অপেক্ষার সময় কমবে, খরচ কমবে এবং সার্বিক কার্যক্রম আরও দক্ষ হবে।
আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলোর মধ্যে করা একটি জরিপেও তৃতীয় টার্মিনালে বিকল্প গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার চালুর পক্ষে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া গিয়েছিল বলে জানা গেছে।
তবে বেবিচক এমন একটি কাঠামো বেছে নিয়েছে, যেখানে যাত্রীসেবা খাতে প্রতিযোগিতা থাকলেও কার্গো অপারেশন—বিমানবন্দর পরিচালনার সবচেয়ে লাভজনক অংশগুলোর একটি—বিমানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে পরিচালনাকারী প্রায় সব এয়ারলাইনসের যাত্রী, ব্যাগেজ ও কার্গো হ্যান্ডলিং করে আসছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এ খাত থেকে বছরে আনুমানিক ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আয় করে সংস্থাটি।
বিমানের জন্য কার্গো হ্যান্ডলিং একটি গুরুত্বপূর্ণ নন-টিকিট আয়ের উৎস। তবে শিল্প সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, এই সিদ্ধান্ত প্রতিযোগিতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কার্গো অগ্নিকাণ্ড থেকে শিক্ষা
গত বছর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর কার্গো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। ওই ঘটনা বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে এবং কাঠামোগত সংস্কারের দাবি ওঠে।
ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি বিমানের ভূমিকা শুধু এয়ারলাইন পরিচালনার মধ্যে সীমিত রাখা এবং ধীরে ধীরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল বলে জানা যায়।
যদিও ওই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি, তবে গুরুত্বপূর্ণ এই কার্যক্রমের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর পুরোপুরি নির্ভরতা রাখা কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
তৃতীয় টার্মিনাল চালুর কারণে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন টার্মিনালে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও উন্নত কার্গো প্রসেসিং প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে, যা আগে শাহজালালে ছিল না।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় দক্ষ অপারেটরের প্রয়োজন রয়েছে।
“আমরা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করেছি, যেগুলো পরিচালনার জন্য বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা দরকার। বিমানের সেই অভিজ্ঞতা না থাকলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”
তিনি বলেন, এতে সরঞ্জামের ক্ষতি হতে পারে, স্থাপনাগুলোর কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং এয়ারলাইনগুলো কার্গো সুবিধা ব্যবহারে আগ্রহ হারাতে পারে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিমান কার্গো ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ থাকার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, শুরুতে কোনো আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান বিমানের সঙ্গে কাজ করলে প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতো।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার প্রয়োজন
টিএএস এভিয়েশন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বিমান চলাচল খাতের উদ্যোক্তা কে এম মজিবুল হক মনে করেন, বিমানবন্দর সেবার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “কার্গো ভিলেজ ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া উচিত।”
তার মতে, মালিকানা সরকারের হাতে থাকলেও পরিচালনার দায়িত্ব দক্ষ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া যেতে পারে। এতে দক্ষতা, নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও সেবার মান বাড়বে এবং স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নেও সহায়তা করবে।
নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এয়ারলাইন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) মহাসচিব মফিজুর রহমান বলেন, বিমানের কার্গো হ্যান্ডলিং আন্তর্জাতিক মানের কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, “সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার মান নিয়ে উদ্বেগ আছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।”
তবে যাত্রী হ্যান্ডলিংয়ে অন্তত প্রতিযোগিতা চালুর উদ্যোগকে ইতিবাচক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সক্ষমতা বনাম একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ
বিমান চলাচল বিশ্লেষক এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রেখে বাংলাদেশ তার সম্ভাবনাময় কার্গো খাতকে কতটা এগিয়ে নিতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, “বিমানের পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ বিমানবন্দর এখন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় চলে গেছে। আমরা সেই জায়গায় পিছিয়ে আছি।”
তার মতে, বাংলাদেশে কার্গো হ্যান্ডলিং খরচ অনেক প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি। ফলে অনেক রপ্তানিকারক বিকল্প রুট ব্যবহার করছেন।
“কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি পণ্য পাঠানোর চেয়ে প্রতিবেশী দেশের বিমানবন্দর ব্যবহার করা সাশ্রয়ী হচ্ছে। খরচ বেশি থাকলে এই প্রবণতা বাড়বে।”
শিল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, তৈরি পোশাক খাতকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বছরে ৪ থেকে ৭ লাখ টন পর্যন্ত আকাশপথে কার্গো পরিচালনার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন কার্গো ভিলেজ, পুরোনো প্রশ্ন
বেবিচক জানিয়েছে, সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ এলাকায় নতুন অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
এতে বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তৃতীয় টার্মিনালের কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের নিয়ন্ত্রণ থাকবে বিমানের কাছেই।
তবে মালিকানা কাঠামো, পরিচালন পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই ভবিষ্যতে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কার্গো পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে বেবিচক বা বিমান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্গো গেটওয়ের ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্ব অবশ্যই স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত।
প্রস্তুত থাকার দাবি বিমানের
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম পরিচালনায় সংস্থাটি প্রস্তুত।
বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বুসরা ইসলাম বলেন, তৃতীয় টার্মিনালের জন্য প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এক হাজারের বেশি অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রী ও কার্গো হ্যান্ডলিং পরিচালনার জন্য প্রস্তুত।”
তিনি আরও জানান, কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে দ্বিতীয় হ্যান্ডলার নিয়োগের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো প্রকল্প তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের এই সিদ্ধান্ত এলো।
জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোয়েই ও নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন নিয়ে গঠিত জাপানি কনসোর্টিয়াম চুক্তি সম্পন্ন হলে নতুন টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।