মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে দুর্নীতি: এজেন্সি মালিকদের সম্পদ খতিয়ে দেখছে দুদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
| Published: Monday, July 06, 2026
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকার নির্ধারিত ফি-এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মালিকদের ব্যক্তিগত সম্পদেরও অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি খাতে দুর্নীতির অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত এগিয়ে নিতে অভিযুক্তদের মধ্যে ২১৩ জনকে সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার জন্য নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
মামলাগুলোতে অভিযোগ করা হয়েছে, ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সি মোট ৭ হাজার ৯৮৪ কোটি ১৫ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ করেছে।
দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ বিভাগের পরিচালক (বর্তমানে অবসরোত্তর ছুটিতে) এসএমএম আখতার হামিদ ভূঁইয়ার সই করা এক চিঠিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার নোটিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা। তার বিরুদ্ধে নিজ নামে ও বেনামিতে পরিচিত আয়ের উৎসের বাইরে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(১) ধারা অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি দুদক তাকে ২১ কর্মদিবসের মধ্যে নিজের, স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের নামে কিংবা বেনামিতে থাকা সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, দায়-দেনা, আয়ের উৎস এবং সম্পদ অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদের বিবরণী দাখিল না করলে বা মিথ্যা তথ্য দিলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ধাপে ধাপে ১৯১ জনকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও ২২ জনকে নোটিশ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
এ পর্যন্ত ১৬৭ জন দুদকে তাদের সম্পদের বিবরণী জমা দিয়েছেন। এসব বিবরণী যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আখতারুল ইসলাম রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা বাসস-কে বলেন, অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং আরও কয়েকজনের ক্ষেত্রে নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি জানান, সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়া ২৫ জনের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সুপারিশ করেছে দুদক। অন্যদের জমা দেওয়া বিবরণীও যাচাই করা হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই আরও তদন্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদের বিবরণী জমা দেবেন না, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আখতারুল ইসলাম আরও বলেন, ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে প্রকৃত সম্পদের অমিল পাওয়া গেলে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করা হবে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ বা ক্রোকের আবেদনও করা হতে পারে।
অভিযুক্তদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপিরাও
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি-এর অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সেই অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগে পৃথকভাবে এক দফায় ১২টি মামলা করেছে দুদক। এসব মামলায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর এবং রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের আসামি করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এএইচএম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল), সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, সাবেক সংসদ সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুস সোবহান ভূঁইয়া, পাশাপাশি বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা যোগসাজশের মাধ্যমে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর নিবন্ধনের শর্ত লঙ্ঘন করেন। সরকার নির্ধারিত প্রতি কর্মীর নিয়োগ ফি ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা হলেও তারা পাসপোর্ট, মেডিকেল পরীক্ষা, বিমান টিকিট ও অন্যান্য খাতের নামে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত আদায় করে অতিরিক্ত অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সাব-এজেন্ট, বিমান টিকিট এবং অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আদায় করা অর্থ সরকার নির্ধারিত নিয়োগ ফি-এর আওতাভুক্ত ছিল না। পরে বিভিন্ন উপায়ে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়।