উপসাগরীয় অরাজকতায় বিপর্যস্ত প্রবাসীদের জীবন-জীবিকা
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Saturday, March 07, 2026
কোলাজ: এভিয়েশন এক্সপ্রেস
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় দেশগামী ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ঝুঁকিতে আছে চাকরি, ভিসা এবং দেশে পরিবার চালানোর নিরাপত্তা।
কাতারগামী ফ্লাইট এখনো পুরোপুরি বন্ধ। ফলে শ্রমিকরা নতুন করে ব্যয়বহুল টিকিট কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। দাম্মাম বিমানবন্দর সম্পূর্ণ বন্ধ। শ্রমিকরা প্রতিদিন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (ঢাকা বিমানবন্দর) আসছেন। বারবার ফ্লাইট বাতিলের পাশাপাশি বাড়তি খরচের দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তারা।
কুমিল্লা থেকে আসা একজন শ্রমিক বলেন, আমার আকামার মেয়াদ ১০ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। যদি কাতারে না পৌঁছাই তাহলে সব হারাবো। চাকরি, বৈধতা, এমনকি ফেরার সুযোগ। মার্চের ৩ তারিখের টিকিট ও নতুন ভিসা নিয়েছিলেন অন্য একজন প্রবাসী। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছে যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট বাতিল হওয়ার খবর পেয়ে হতাশ হন তিনি।
এখন প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আর্থিক লোকসান। যাত্রীদের মূল ট্রাভেল এজেন্সি থেকে টাকা ফেরত নিতে হয়। তারপর বেশি দামে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নতুন টিকিট কিনতে হয়। অনেকে প্রথম দিকেই ফ্লাইট বুকিং এবং রাজধানীতে আবাসনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে দৈনিক হাজার হাজার টাকা খরচ করেছেন।
এখন পর্যন্ত আগের যাত্রীদের নিয়ে উপসাগর থেকে ৪টি ফ্লাইট দেশে এসেছে। মাস্কাট থেকে আসা যাত্রীরা ঠিকমতো সফর সম্পন্ন করতে পারলেও সৌদি আরব ও দুবাই থেকে থেকে আসা যাত্রীদের চার-পাঁচ দিন দেরী হয়। দোহা ও মদিনার ফ্লাইট সকাল ১০:৩০ ও ১০:৪৫ বাজে নির্ধারিত হলেও সঠিক সময়ে ছাড়ার নিশ্চয়তা কম।
জীবন-ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রবাসী কর্মীরা বলছেন, সফর করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। একজন শ্রমিক বলেন, আমরা জানি দুবাইয়ে বোমা পড়ছে। জানি হয়তো বেঁচে ফিরব না। কিন্তু না গেলে পরিবার কী খাবে? আরেকজন বলেন, সরকার আমাদের সন্তানদের খাওয়াবে না। বোমার কবলে পড়তে হলেও আমাদের যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া আরও সমস্যার সৃষ্টি করছে। কেউ দুপুরে ফ্লাইটের নিশ্চয়তা পেলেও বিমানবন্দরে গিয়ে দেখেন কোনো ডিপারচার শিডিউল নেই। চার ঘণ্টা পর ফিরে আসতে বলেন পুশিল কর্মকর্তারা। অথচ ভিসার মেয়াদও শেষ হতে যাচ্ছে।
বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারীদের জীবনও নিরাপদ নয়। একজন প্রবাসী শ্রমিক বলেন, যারা সেখানে বাস করছেন তারা ভয় পাচ্ছেন। আমরা যারা যাচ্ছি আমরাও ভয় পাচ্ছি। কিন্তু পরিবারের রুটি-রুজির জন্য আমাদের যেতেই হবে।
রাজধানীতে একই কক্ষে একাধিক পরিবার থাকায় কষ্টও বাড়ছে জানান একজন। তিনি বলেন, সবাই জানে, এমনভাবে থাকা কতটা কষ্টকর।
কিছু প্রবাসী শ্রমিক এমনটাও শুনেছেন যে আকামার মেয়াদ নাকি এক মাস বাড়ানো হতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন তারা। একজন প্রশ্ন করেন, যদি সেটা কার্যকর না হয়, আমরা কীভাবে ঐ দেশে প্রবেশ করবো? নতুন ভিসা নিলে কী প্রবেশ করা যাবে?
ট্রাভেল এজেন্সির বিভ্রান্তিও সমস্যা বাড়াচ্ছে। কোন এয়ারলাইন চলছে, টাকা ফেরত নেয়ার নিয়ম কিংবা ফ্লাইট ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে জানান প্রবাসী কর্মীরা। বিমানবন্দরের ডিজিটাল ডিসপ্লেতে শিডিউল খালি থাকায় বিদেশ সফরের অনিশ্চয়তায় সময় কাটাচ্ছেন শত শত যাত্রী।
বিদেশ থেকে যাত্রীরা নিরাপদে বিমানবন্দরে পৌঁছালে অপেক্ষমাণ পরিবারের সদস্যরা স্বস্তি পান। তবে অনেকেরেই ফিরে আসতে দেরী হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রবাসীরা এমনটাও জানান যে মিডিয়ায় বাস্তব চিত্রের চেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। বাস্তব জটিলতা ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এলাকার কিছু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। প্রবাসী কমিউনিটিতে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তারা।
আতঙ্কে আছেন প্রবাসী কর্মীরা। তাদের মধ্যে একজন বলেন, প্রবাসীদের জীবন সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। আমরা বিপদের মধ্যেই থাকি। আমরা এটা জানি যে এখন বোমা পড়ছে। কিন্তু বেঁচে ফিরবো কি-না তা জানিনা । তবুও যাই। কারণ পরিবার আমাদের রোজগারেই টিকে আছে।