বাজার আছে, এয়ারলাইন্স প্রস্তুত: টার্মিনালের অভাবে উড়ছে না নতুন ফ্লাইট
সিনিয়র প্রতিবেদক
| Published: Sunday, February 01, 2026
ছবি: এভিয়েশন এক্সপ্রেস গ্রাফিক্স
-তারেক আলিফ
দেশের এভিয়েশন ব্যবসার পরিধি দ্রুত হারে বাড়ছে। বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর কম সময়ে যাতায়তের জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (ঢাকা এয়ারপোর্ট) ধারণক্ষমতা বাড়াতেই আধুনিক তৃতীয় টার্মিনালটি বানানো হয়। সম্ভাবনা দেখে এক ডজনেরও বেশি বিদেশে এয়ারলাইন ব্যবসায় যোগ দিতে চায়। তবে টার্মিনাল সচল না হওয়ায় ব্যবসার সুযোগই পাচ্ছে না এয়ারলাইনগুলো।
টার্মিনালটি আন্তর্জাতিক মানে নির্মিত হলেও চালু না হওয়ায় নতুন এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ আসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) উচ্চপর্যায়ের সূত্র এভিয়েশন এক্সপ্রেসকে জানায়, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় ১৫টি বিদেশি এয়ারলাইন ঢাকায় ফ্লাইট চালু করতে চায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে অনেকেই। দ্বিপক্ষীয় আলোচনাও চলমান। নতুন করে আগ্রহও প্রকাশ করছে কোনো কোনো এয়ারলাইন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দেশে উচ্চহারের যাত্রী চাহিদা আছে। একাধিক এয়ারলাইন সেবা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু তৃতীয় টার্মিনাল ছাড়া আমরা কার্যকর সেবা দেওয়ার সক্ষমতা পাবো না। কারণ এয়ারপোর্টে নতুন এয়ারলাইনের উড়োজাহাজ রাখারই জায়গা নেই।
বাজার চাহিদা আছে, কিন্তু সেবা দেওয়ার সুযোগ নেই
ঢাকায় ফ্লাইট চালুর জন্য সক্রিয়ভাবে আগ্রহ দেখানো এয়ারলাইনগুলোর মধ্যে অন্যতম ইরানের ‘মাহান এয়ার’ অন্যতম।
তেহরান–ঢাকা–তেহরান রুটে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল অধিকার ‘ফিফথ ফ্রিডম’ চেয়ে অনুমতির জন্য আবেদন করে।
উল্লেখ্য, ফিফথ ফ্রিডম বলতে বুঝায় এমন একধরনের সুবিধাকে বোঝায় যা পেলে কোনো দেশের এয়ারলাইন নিজ দেশ থেকে উড়ে গিয়ে অন্য কোনো দেশে থেমে সেখান থেকে আরেক দেশে যাত্রী বা কার্গো বহন করতে পারে।
গত বছরের ৮ ডিসেম্বর কূটনৈতিক মাধ্যমে পাঠানো ঐ অনুরোধ বেবিচকের কাছে পৌঁছায়।
ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে বেবিচক সরাসরি সিদ্ধান্ত না জানিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাছে দিকনির্দেশনা চায়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্স বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এয়ার সার্ভিসেস অ্যাগ্রিমেন্ট (এএসএ) হালনাগাদ করতে কাজ করছে। হ্যানয়–ঢাকা–হ্যানয় রুটে ফ্লাইট চালুর জন্য দুই পক্ষ নীতিগতভাবে একটি সমঝোতা চুক্তি স্মারকে সাক্ষর করতে রাজি হয়। বেবিচক ইতোমধ্যেই খসড়া স্মারক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে সৌদি আরবের নতুন প্রিমিয়াম এয়ারলাইন রিয়াদ এয়ার ঢাকায় ফ্লাইট চালুর বিষয়ে জোরালো আগ্রহ দেখায়। তারা সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৪টি ফ্লাইট পরিচালনার অনুমোদন চায়। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী ঐ দেশের সরকার এখনো আনুষ্ঠানিভাবে অনুমোদনের আবেদন জানায়নি।
সৌদির বাজেট এয়ারলাইনগুলোরও এদেশে সেবা দেওয়াতে আগ্রহ আছে। হজকেন্দ্রিক ফ্লাইট পরিচালনাকারী ফ্লাইনাস নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা দেখছে। ফ্লাইআদিল এদেশে এখন সপ্তাহে দুইটি ফ্লাইট পরিচালনা করলেও ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর আভাস দিচ্ছে।
এদের মধ্যে উইজ এয়ার আবুধাবিকে দেশে আনতে না পারায় বড় ধরনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে কম ভাড়ার এই এয়ারলাইন ঢাকায় ফ্লাইট চালু করার আবেদন করলেও স্লট সংকটের কারণে বেবিচক চট্টগ্রামে ফ্লাইট চালু করার প্রস্তাব দেয়। শেষ পর্যন্ত ঐ এয়ারলাইন এদেশে কোনো ফ্লাইটই চালু করলো না।
বাড়ছে অঞ্চলভিত্তিক আগ্রহ
উপমহাদেশে পাকিস্তানের এভিয়েশন খাতে যুক্ত হতে পারে ঢাকা। বেবিচক ইতোমধ্যেই পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ), ফ্লাই জিন্নাহ ও এয়ার সিয়ালের জন্য পাওয়া সরকারি আবেদন অনুমোদন করেছে।
পাকিস্তান ছাড়াও এয়ার ইন্ডিয়া গ্রুপের কম খরচ শাখার এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস ফ্লাইট চালু করার জন্য প্রস্তুত থাকলেও উপযুক্ত স্লট না পাচ্ছে না।
মধ্য এশিয়া থেকে উজবেকিস্তান এয়ারওয়েজ ঢাকায় আসার আগ্রহ দেখালেও জেনারেল সেলস এজেন্ট সংক্রান্ত জটিলতায় অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
ইউরোপ থেকে এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আগ্রহ না দেখা গেলেও, কেএলএম ও এয়ার ফ্রান্স বেবিচকের সঙ্গে আলোচনা করে বলে জানা গেছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে এই দুই এয়ারলাইন দীর্ঘপাল্লার যাত্রায় ফ্লাইট পরিচালনার পাশাপাশি কার্গো সেবাও দিতে পারবে।
পূর্ব এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের সাথে এএসএ হালনাগাদে আগ্রহী। বর্তমানে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) অনুমোদনে এদেশে যাতায়তের জন্য চার্টার ফ্লাইট চলছে।
এছাড়া রয়্যাল ব্রুনাই এয়ারলাইন্সও ঢাকায় ফ্লাইট চালু করার আগ্রহ দেখিয়েছে। নেপালের শ্রী এয়ারলাইন্সের নামও গণমাধ্যমে এসেছে ঠিকই, কিন্তু বেবিচকের সাথে এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করেনি বলেই জানা গেছে।
অবকাঠামোই এখন বড় বাধা
ঢাকা বিমানবন্দের সক্ষমতা সংকট উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বছরে মাত্র ৮০ লাখ যাত্রী ধারণক্ষমতার বিমানবন্দরকে গত বছর প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ যাত্রীর ধকল সামলাতে হয়। প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার যাত্রী নিয়ে গড়ে ১৬০ থেকে ১৬৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে।
ফলে প্রচন্ড ভিড়, যাত্রীদের চলাচলে ধীরগতি এবং যানজট নিত্যদিনের চিত্র হয়ে উঠেছে।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ২৫০ জন যাত্রী আসে। প্রত্যেকের সাথে যদি দুজন করেও আসে, তাহলে টার্মিনালের ভেতরে মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজারে।
নতুন রুট বিবেচনায় এয়ারলাইনগুলোর কাছে যাত্রীদের অভিজ্ঞতা, টার্নঅ্যারাউন্ড সময় এবং ব্র্যান্ডের সুনামের মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অচল তৃতীয় টার্মিনাল
পুরো বিমানবন্দরের অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে তৃতীয় টার্মিনাল। অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেলেও কার্যক্রম এখনো চালু হয়নি।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক একাধিকবার জানান, কাজের প্রায় ৯৯ শতাংশ শেষ।
তবে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা চুক্তি নিয়ে রাজস্ব বণ্টন সংক্রান্ত জটিলতায় টার্মিনাল উদ্বোধনই করা হলো না। বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন স্বীকার করেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে এই টার্মিনাল চালু হবে না।
অথচ পরিকল্পনা ছিল জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-জাইকা অর্থায়নে নির্মিত এই টার্মিনাল কার্গো সক্ষমতা দ্বিগুণ হারে বাড়ানোর পাশাপাশি ঢাকাকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করবে।
হারাচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা
সাবেক বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু না হওয়ায় বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন এয়ারলাইন ও রুট যোগ করে এভিয়েশন খাতে প্রবৃদ্ধির পথ খুলে দিতেই টার্মিনালটি নকশা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের সাথে প্রায় ৫৫টি দেশের আকাশপথে সেবা দেওয়ার চুক্তি রয়েছে। আর টার্মিনালটি চালু হবে, এই প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই একাধিক বিদেশি এয়ারলাইন তাদের উড়োজাহাজ ও নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা সাজিয়েছিল।
তিনি বলেন, নির্ধারিত সময় মানা না হলে এয়ারলাইনগুলো আস্থা হারিয়ে ফেলে। তারা অনেক বছর আগেই ব্যবসার পরিকল্পনা করে থাকে। তবে সুযোগ না পেলে অন্য বাজারে চলে যায়। এতে যাত্রীরা প্রতিবেশী দেশের হাব ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। ফলে খরচ বাড়ে। অর্থনৈতিক সুফল চলে যায় দেশের বাইরে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, নতুন এয়ারলাইন এলে প্রতিযোগিতা বাড়তো, ভাড়াও কমতো। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা ও স্লট সংকটের কারণে তাদের আস্থা কমে গেছে। অনেক এয়ারলাইন ইতোমধ্যেই অন্য রুটে তাদের উড়োজাহাজবহর সরিয়ে নিয়েছে।
তার মতে, একবার উড়োজাহাজাবহর অন্য রুটে চলে গেলে শীঘ্রি ফিরবে না।
কমছে সুযোগ
মহামারির পর বিশ্বজুড়ে এয়ারলাইনগুলো নতুন বাজার খুঁজছে। ঢাকা সেই সম্ভাবনাময় বাজার হলেও অবকাঠামো ও সিদ্ধান্তহীনতায় সেই সুযোগ কমছে।
‘এয়ারলাইনগুলো ঢাকায় আসতে চায় কি-না?’, এই প্রশ্ন এখন আর করা যাবে না। বরং, ‘ঢাকা কি তাদের গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত?’, সেই প্রশ্নই করতে হবে।