নির্বাচনের আগে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করতে এতো তড়িঘড়ি কেন?
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Sunday, February 01, 2026
ফাইল ছবি
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স (বিমান) ও মার্কিন উড়োজাহাজ উৎপাদনকারী কোম্পানি বোয়িংয়ের মধ্যে বড় অঙ্কের টাকায় উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করতে তৎপরতা চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে অনির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে এত বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে।
প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে মোট ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার কথা রয়েছে। এর মধ্যে আটটি বোয়িং ৭৮৭–১০ ড্রিমলাইনার, দুইটি ৭৮৭–৯ এবং চারটি ৭৩৭–৮ ম্যাক্স। চুক্তিতে প্রাথমিক দাম নির্ধারণ করা হয় ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
বিমান ও সরকারি উচ্চপদস্থ সূত্র জানায়, চলতি সপ্তাহেই আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হতে পারে।
ভোটের মাত্র ১১ দিন আগে এমন বড় ধরনের চুক্তি চূড়ান্ত করার উদ্যোগে ম্যান্ডেট, স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি নিয়েও এভিয়েশন খাতে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
চুক্তির মোট মূল্যে ১০ শতাংশ ছাড় আদায়ের শেষ মুহূর্তের চেষ্টা হিসেবে বোয়িংয়ের সিয়াটল সদরদপ্তরে একটি জরুরি চিঠি পাঠায় বিমান।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বোয়িং ইতিমধ্যেই যতটা ছাড় দেওয়ার ছিল, প্রায় সবটাই দিয়ে ফেলেছে। তাই এখন নতুন করে আরও ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার সুযোগ খুবই কম। ফলে বিমানের মূল্যছাড় চাওয়ার প্রস্তাবটি গ্রহণ হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
মাসের পর মাস ধরে আলোচনা চললেও সম্প্রতি আলোচনার গতি বেড়েছে। শুরুতে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কৌশল থাকলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সময়সীমা কমে আসায় এখন দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার দিকে ঝুঁকছে কর্তৃপক্ষ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের এক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, “আগে ব্যবস্থাপনা বিভাগ দাম, লেনদেনের শর্ত, ডেলিভারির সময় ও পাইলট প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ধাপে ধাপে এগোতে চেয়েছিল। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে চুক্তি সই করা।”
বোয়িংয়ের চূড়ান্ত জবাব এ সপ্তাহে এলে তা প্রধান উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন মিললে একই দিনে বিমানের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক আয়োজিত হবে। ঐ বৈঠকেই নির্বাচনের আগেই চুক্তি সই করা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বোয়িংয়ের প্রস্তাবিত দাম ২০২৪ সালের ডলারমূল্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত, আর উড়োজাহাজ সরবরাহের সময়সীমা ধরা হয়েছে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে। ডেলিভারি যে সময়ে হবে সেই সময়ের বিনিময় হার অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হবে। চূড়ান্ত মূল্য মূল্যস্ফীতির সাথে সমন্বয় করা হবে।
বিমান সূত্র জানায়, প্রতি বোয়িং ৭৮৭–৯ ড্রিমলাইনারের দাম প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। আরব প্রতি ৭৩৭–৮ ম্যাক্সের দাম প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
সম্প্রতি বোর্ড পুনর্গঠনের পর চুক্তির সময় নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। নির্বাচনের এক মাসেরও কম সময়ের আগে বিমানের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
এর আগে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিনকে বিমানের বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। ফলে সংস্থার শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে পুরোনো উদ্বেগ আবারও সামনে চলে আসে।
একজন বিমান খাত বিশ্লেষক বলেন, “এত বড় চুক্তির ঠিক আগে বোর্ডের গঠন বদলালে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে এখনই কেন, এবং এর পেছনে উদ্দেশ্যটা কী?”
চুক্তি সই হলেও বিমানের তাৎক্ষণিক সংকট কাটবে না। ২০৩৫ সালে উড়োজাহাজ সরবরাহ করা হলেও পরবর্তী অন্তত পাঁচ বছর সক্ষমতা সংকটে থাকবে সংস্থাটি।
তখন সামাল দিতে অন্তত চারটি উড়োজাহাজ লিজ দেওয়ার জন্য বোয়িংয়ের কাছে অনুরোধ জানায় বিমান। বোয়িং মৌখিক আশ্বাস দিলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
দীর্ঘমেয়াদে এই বোয়িং চুক্তি বিমানের বহর আধুনিকীকরণ এবং বাংলাদেশের বিমান পরিচালনার সক্ষমতা জোরদার করতে পারে। তবে নির্বাচনকালীন তাড়াহুড়া, বোর্ড পুনর্গঠন এবং কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে চুক্তি এগোনোর প্রক্রিয়ার ধরণ দেখে অনেকের মনেই অতীতের নজির ও বর্তমানের জবাবদিহিতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে।
যদি শেষমেষ আলোচিত উড়োজাহাজগুলো আকাশে উড়তে পারে তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের এ সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে, নাকি ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে তার বিচার ভবিষ্যতে নিরীক্ষক ও নির্বাচিত সরকারই করবে।