Logo
এয়ারলাইন্স এয়ারপোর্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স পর্যটন হোটেল প্রবাস লাইফস্টাইল কর্পোরেট রেগুলেটরস মুখোমুখি

Aviation Express

শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খাবারের রাজ্য নাজিরাবাজার

ডেস্ক রিপোর্ট | Published: Tuesday, February 03, 2026
শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খাবারের রাজ্য নাজিরাবাজার

ছবি: ওহিদুজ্জামান টিটু

বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার। কোনো সরকারি স্বীকৃতি বা সাইনবোর্ড ছাড়াই দেশজুড়ে খাবারপ্রেমী মানুষ এবং বিদেশি দর্শনার্থীদের মনোযোগ টানছে এই এলাকা।

রাত নামলেই নাজিরাবাজারে ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। তামার হাঁড়িতে বিরিয়ানির চালের ভাপ, কয়লার আগুনে ঝলসানো শিক কাবাব, আর সদ্য বানানো লাচ্ছি, এই সবমিলিয়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। একসময় স্থানীয় খাবারের গলি হিসেবে পরিচিত নাজিরাবাজার এখন পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক কেন্দ্র।

তবে নাজিরাবাজার স্থাপত্য বা জাদুঘরনির্ভর ঐতিহ্যবাহী এলাকার মতো নয়। এই স্থানের সাথে বাঙালি খাবার সংস্কৃতির গভীর সংযোগ আছে। বহু যুগ আগের রান্নাঘর যেমনি আছে, তেমনি আছে আধুনিক ক্যাশ কাউন্টার। অতীত ও বর্তমান এখানে কোনো দ্বন্দ্ব ছাড়াই সহাবস্থান করছে। চা কাপ প্রতি দশ টাকা বিক্রি করা টংয়ের দোকান  অনায়াসে প্রতিযোগিতা করছে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁর সঙ্গে।

ফুলবাড়িয়া ফায়ার সার্ভিস সড়ক দিয়ে হেঁটে ঢুকলেই চোখে পড়ে হোটেল ওয়ান স্টার। ভাত, মাছ-মাংস, চিকেন পোলাও, কাচ্চি বিরিয়ানি, লাচ্ছি ও ফালুদার জন্য জায়গাটি সুপরিচিত। কয়েক কদম এগোলেই দেখা যাবে ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিউটি লাচ্ছির রেঁস্তোরা। ঘন মসৃণ লাচ্ছি, মালাই লাচ্ছি ও ফালুদার খেতে এসে প্রতি রাতেই লাইন দিয়ে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে। হরহামেশাই স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, পর্যটক ও বিদেশি অতিথিদের ভিড় লেগেই থাকে।

বিউটি লাচ্ছির ঠিক সামনে পান্নু খানের চায়ের দোকান। এখানে এখনো দশ টাকার আইকনিক চা পাওয়া যায়। আশপাশের ভাতের দোকান ও রুটির দোকানগুলোতেও সারাক্ষণ ক্রেতাদের আনাগোনা থাকে। এখানেই ১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হাজী বিরিয়ানি পুরনো টেবিল-চেয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। আর হানিফ বিরিয়ানি রেঁস্তোরায় খাসির বিরিয়ানির বিশেষ ভক্তগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।

রাস্তা ধরে এগোলে বামে দেখা যায় আলাউদ্দিন সুইটস, ডানে বুখারি বিরিয়ানি ও হাজী নান্না বিরিয়ানি। এই রেঁস্তোরাগুলোয় বাসমতি কাচ্চি বিরিয়ানি, চিকেন পোলাও, বোরহানি ও দুধ বাদামের শরবত পাওয়া যায়। গভীর রাতেও আইসক্রিমের দোকানে শিশুসহ পরিবারগুলোকে দেখা যায়।

নাজিরাবাজার মোড়ে পৌঁছালেই কাবাবের ঘরগুলো চোখে পড়ে। বিসমিল্লাহ কাবাব ও বাদশাহী কাবাব রেঁস্তোরা থেকে গরুর চাপ, চিকেন চাপ, গুর্দা কিংবা বটি কাবাব ঝাঁঝালো তেলে ছাড়ার শব্দ কানে আসে। কাছেই বাকারখানির দোকানগুলো মনে করিয়ে দেয় যে বাঙালির নাস্তার মধ্যেও ঐতিহ্য আছে।

বাংলাদেশ ফিল্ড রোডে ডানদিকে মোড় নিয়ে এগোলেই গরুর তেহারির রাজ্যে প্রবেশ করা যায়। মামুন বিরিয়ানি, মোতি বিরিয়ানি, মদিনা বিরিয়ানি, খুশবু বিরিয়ানি ও কাশ্মীর বিরিয়ানি একে অপরের সঙ্গে খাবারের গন্ধ ও জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রতিযোগিতা করে। নতুন ঢাকার তেহারি ঘরও সরিষার তেলে রান্না করা তেহারি দিয়ে পুরান ঢাকার নিয়মিত ভোজনরসিকদের মন জয় করেছে।

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁর মধ্যে রয়েছে গ্র্যান্ড নবাব ও টেস্ট অব নবাব। এই রেঁস্তোরাগুলোতে আছে ব্যক্তিগত বসার ব্যবস্থা, সামুদ্রিক খাবার ও গ্রিলড বারবিকিউ। এর চারপাশে বেশ কয়েকটা ছোট ছোট দোকানে চা, কফি, মিল্কশেক, সফট ড্রিংক এমনকি আগুন পানের পাশাপাশি বিশ পদেরও বেশি ঐতিহ্যবাহী মসলাদার পান পাওয়া যায়।

বৃহস্পতিবার, শুক্রবার এবং যেকোনো ছুটির আগের রাতে নাজিরাবাজার হয়ে ওঠে খোলা আকাশের নিচে উৎসবস্থল। পুরো এলাকা ঘুরে দেখা যায় পরিবার নিয়ে হাঁটাহাঁটি, ফুড ভ্লগারদের শুটিং, অপরিচিত মানুষের সাথে এক টেবিলে বসে খাওয়া আর হাসি হাসি মুখ।

গুলশানের বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, পুরান ঢাকার প্রায় সব ঐতিহ্যবাহী খাবার এখানে পাওয়া যায়। কেউ না খেয়ে ফেরে না। খাবারের বাইরেও এখানে যে উৎসবমুখর পরিবেশ পাওয়া যায়, তা নতুন ঢাকায় পাওয়া যায় না।

বাড্ডা থেকে আসা মউরি দোলা বলেন, যাতায়াত সহজ হওয়ায় সুবিধা পাওয়া যায়। ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে এসে হেঁটে ঢোকা যায়। পুরান ও নতুন ঢাকার মাঝামাঝি অবস্থান হওয়ায় নাজিরাবাজার আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আইনাল হোসেন মনে করেন, নাজিরাবাজারের সরকারি স্বীকৃতি প্রয়োজন। তিনি বলেন, এখন অন্য জেলা থেকেও মানুষ আসে। তারা সারারাত থাকে। পরে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যায়। এই ফুড স্ট্রিট সরকারি স্বীকৃতি পেলে রাতের বেলায় বৈধভাবে দোকান চালানো যাবে এবং ব্যবস্থাপনাও উন্নত হবে।

আব্দুল্লাহ টাওয়ারের কাছে আলাদা পার্কিং সুবিধা তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এটি অবকাঠামো উন্নয়নের ইতিবাচক ইঙ্গিত। নাজিরাবাজারেই রয়েছে রাজধানীতে প্রস্তুত এক বাস্তবধর্মী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক খাদ্য পর্যটনের নকশা। সাথে রয়েছে এক প্লেট মুখরোচক খাবার আর এক রাতের বর্ণিল অভিজ্ঞতা।

Make Comment

Login to Comment
Leaving AviationExpress Your about to visit the following url Invalid URL

Loading...
Comments


Comment created.

Related News