Logo
এয়ারলাইন্স এয়ারপোর্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স পর্যটন হোটেল প্রবাস লাইফস্টাইল কর্পোরেট রেগুলেটরস মুখোমুখি

Aviation Express

২০০ টাকা ভাড়ায় রাত্রিযাপনের সুযোগ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের

শাহজালাল বিমানবন্দর সংলগ্ন ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার

২০০ টাকা ভাড়ায় রাত্রিযাপনের সুযোগ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের

ছবি: সংগৃহীত

মুসা আহমেদ


রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সাময়িক আবাসনে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে 'ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার’। এখানে মাত্র দুইশ টাকায় একরাত থাকতে পারেন প্রবাসী কর্মীরা। এ সেন্টার থেকে বিমানবন্দরে ফ্রিতে যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে। 


শাহজালাল বিমানবন্দর সংলগ্ন খিলক্ষেতের বরুয়ার লঞ্জনীপাড়ায় ওই ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের অবস্থান। অনেকটা গ্রামীণ পরিবেশে এ সেন্টারটি নির্মাণ করেছে সরকার। এখন সেন্টারটি পরিচালনা করছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। 


প্রবাসী কর্মীদের বিদেশ গমন ও ফিরার সময় সাময়িক অবস্থানের জন্য অনলাইনে বা সরাসরি এই সেন্টারে আবেদন করা যাবে। এ জন্য বিএমইটি’র বহির্গমন ছাড়পত্র বা বোর্ডের নিবন্ধন (মেম্বারশীপ) প্রমানক, পাসপোর্টের কপি ও বিমানের টিকেটের কপি লাগবে। এখানে ১০০ টাকা ভর্তি ফি এবং প্রতি রাতের জন্য সিট ভাড়া ২০০ টাকা।


তবে প্রচারণার অভাবে প্রবাসী কর্মীদের অনেকেই এই সেন্টারের নাম, ঠিকানা জানেন না। এ কারণে এখন অনেকেই সেখানে যেতে উৎসাহ পাচ্ছেন না। অথচ প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের ভেতর পরিবেশ খুব পরিপাটি। দেখতে অনেকটা রিসোর্টের মতো।


প্রবাসী কর্মীদের অভিযোগ, প্রবাসী কর্মীদের বিদেশে যাওয়া-আসার প্রক্রিয়ায় বড় একটি সমস্যা ঢাকায় আবাসন। অনেকের যাওয়ার আগে ঢাকায় এসে থাকতে হয় কিংবা দেশে ফিরে থাকার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে বেশি খরচে হোটেলে ওঠা ছাড়া উপায় থাকে না। অনেকে বিমানবন্দর প্রাঙ্গণেই মশার কামড় খেয়ে রাত কাটান। অথচ এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য বিমানবন্দর সংলগ্ন 'ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার’ রয়েছে; এটি তারা জানেন না। ফলে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ফ্লাইটের এক-দুদিন আগে অনেকে ঢাকায় আসেন। ওঠেন আশপাশের আবাসিক হোটেলে।


তবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা জানান, ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার চালুর পর পত্রপত্রিকা-টেলিভিশনে অনেক বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। প্রচার করা হয়েছে সেন্টারের সুযোগ-সুবিধার কথা। তারপরও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছেন না তারা। ফলে সেন্টারের ৯৯ শতাংশ শয্যাই ফাঁকা থাকছে।


ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ১৮ মার্চ বিদেশগামী ও প্রবাসফেরত কর্মীদের সাময়িক আবাসন সুবিধাসহ বিভিন্ন সেবা দিতে শাহজালাল বিমানবন্দরের সন্নিকটে ১৪০ কাঠা জমির ওপর ‘বঙ্গবন্ধু ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার’ উদ্বোধন করে সরকার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই সেন্টারের নাম থেকে 'বঙ্গবন্ধু' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। এখন স্থাপনাটি ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার নামে পরিচিত। এই সেন্টারে ৪০ জন পুরুষ ও ১০ জন নারীর থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। 


তবে ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সন্নিকটে বলা হলেও আদতে তা কাছে নয়। এটি বিমানবন্দর থেকে অন্তত ছয় কিলোমিটার দূরে খিলক্ষেতের বরুয়ার লঞ্জনীপাড়ায়। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, নিরিবিলি সবুজ পরিবেশে প্রাচীর ঘেরা বঙ্গবন্ধু ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার। দেখতে অনেকটা রিসোর্টের মতো। সেখানে একটি দ্বিতল ভবনের নিচতলায় প্রবাসী কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। পরিপাটি প্রতি কক্ষে তিন-চারটি করে শয্যা। তবে কোনো প্রবাসী কর্মীকে সেখানে দেখা যায়নি। ক্যান্টিনও দেখা গেছে বন্ধ। সেন্টারে সামনে বসে গল্প করার জন্য রয়েছে সবুজ মাঠ। যার চারপাশে রয়েছে দেশি-বিদেশি প্রজাতির অসংখ্য ফল-ফুল গাছ। এমন পরিবেশ যে কারও প্রশান্তি দেবে।


ভবনের নিচতলায় অভ্যর্থনা কক্ষ। এখানে ওমানগামী প্রবাসী মাজহারুল আলমকে পাওয়া যায়। গত ১০ জানুয়ারি তার কাতার যাওয়ার ফ্লাইট ছিল। কিন্তু ফ্লাইট মিস হওয়ার কারণে একটি তিনি এই সেন্টারে অবস্থান করছেন। পরে ১৪ জানুয়ারি আরেকটি ফ্লাইটে ফের টিকিট কিনে বিদেশ যান।


আলাপকালে মাজহারুল জানান, তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনায়। ১০ জানুয়ারি রাতে তার ফ্লাইট ছিল। কিন্তু যথাসময়ে তিনি বিমানবন্দরে উপস্থিত হতে পারেননি। তার এক পরিচিতজনের কাছ থেকেই সেন্টারের খোঁজ পেয়েছেন। এখানে সেবার মানে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তিনি।


এই সেন্টারে সেন্টারের তত্ত্বাবধায়ক সহারি আতিকুর রহমান। তিনি জানান, সেন্টারটি চালু হওয়ার পর দিনে ১৫ থেকে ২০ জন পর্যন্ত প্রবাসী কর্মী আসত। কিন্তু বছরখানে আগে সেন্টারের সামনের রাস্তা সংস্কার কাজ শুরু হওয়ায়, প্রবাসী কর্মীর সংখ্যা কমে গেছে। এখন দিনে এক-দুইজন সেন্টারে যান। তবে রাস্তার সংস্কার কাজ শেষ হলে প্রবাসী কর্মীদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। 


তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ট্রার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২ এর নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। এই দুটি টার্মিনালের নিচতলা দিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখেন প্রবাসফেরত কর্মীরা। আর দ্বিতীয় তলা দিয়ে প্রবাসে যান। কিন্তু তাদের কেউ বঙ্গবন্ধু ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের খোঁজ জানেন না। শত শত প্রবাসী শ্রমিককে টার্মিনাল দুটির সামনে মালামাল নিয়ে অবস্থান করতে দেখা গেছে।


গত ১৮ জানুয়ারি জামালপুর থেকে রাত ২টায় শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনাল-২ এর দ্বিতীয় তলায় পৌঁছান সৌদি প্রবাসী মোস্তাক হোসেন। ১৯ নভেম্বর রাত ১০টায় তার ফ্লাইট। এই ফ্লাইট মিস হওয়ার আশঙ্কা আগেভাগেই তিনি বিমানবন্দরে চলে যান। আলাপকালে মোস্তাক হোসেন বলেন, বিমানবন্দরের আশপাশের হোটেলে ভাড়া বেশি। তাই টার্মিনালের সামনে বেঞ্চে বসেই সময় পার করছি। এসময় তাকে বঙ্গবন্ধু ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের কথা তা জানালে তিনি এই সেন্টার বিষয়ে অবগত নন বলে জানান।


এসময় পাশে থাকা দুবাই প্রবাসী বদরুল হায়দার বলেন, সরকার প্রবাসীদের কাছে শুধু রেমিট্যান্স চায়। কিন্তু তাদের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা দিতে চায় না। এখন বঙ্গবন্ধু ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার যদি নির্মাণ করেও থাকে, তা প্রচারে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে।



ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারে সুযোগ-সুবিধা:

ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারে শুধু আবাসন নয়, এখানে প্রবাসী কর্মীদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে। এই সুযোগ-সুবিধাগুলোর মধ্যে বিদেশগামী ও ফেরত প্রবাসী কর্মীরা একশ টাকা ফি দিয়ে সরাসরি বা অনলাইনে ভর্তির আবেদন করতে পারবেন। একজন কর্মী আবেদন করতে পারবেন একটি সিটের জন্য। প্রতি রাতের জন্য সিট ভাড়া ২শ টাকা এবং প্রতিবার সর্বোচ্চ দুই রাত অবস্থান করা যাবে। অবস্থানের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট ও এয়ার টিকিটের কপিসহ লাগবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।


বিমানবন্দর থেকে সেন্টারে যাতায়াতের জন্য ফ্রি পরিবহন সুবিধা রয়েছে। সেফ লকারে লাগেজসহ মূল্যবান মালামাল সংরক্ষণের ব্যবস্থা, টেলিফোন সুবিধা, ইন্টারনেট ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেন্টারটিতে।


এছাড়া কর্মীদের জন্য কাউন্সিলিং ও মোটিভেশনের ব্যবস্থা, প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থাসহ সাশ্রয়ী মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে এই সেন্টারে। নারী-পুরুষের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থাও এখানে রয়েছে। এখানে প্রবাসী কর্মীদের রি-ইন্টিগ্রেশন (পুনঃএকত্রীকরণ) এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বা করণীয় সম্পর্কে ব্রিফিং করা হয়। ফলে বঙ্গবন্ধু ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারটি প্রবাসী কর্মীদের একত্রিত হওয়ার এবং পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য একটি উপযুক্ত স্থান, যা দেশে এই প্রথম।


বুকিং

১০০ টাকা দিয়ে বঙ্গবন্ধু ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারে সরাসরি বা অনলাইনে বুক করার সুযোগ রয়েছে। অনলাইনে বুকিংয়ের জন্য ০১৩১০৩৫০৫৫৫, ০১৭৫৪৭১৫৭২০ নম্বরে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা যাবে।



ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার ব্যবহারে ফ্লাইট মিস কমবে

সম্প্রতি বিমানবন্দর সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে বিআরটিএ প্রকল্পের কাজের জন্য এই সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে যদি ভারি বৃষ্টিপাত হয়, তাহলে এই সড়কে যানবাহন চলাচল স্থবির হয়ে যায়। এতে অসংখ্য যাত্রী নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দর যেতে পারছেন না, ফ্লাইট মিস করছেন। তাই বঙ্গবন্ধু ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের প্রচারণা বাড়লে ফ্লাইট মিসের হার অনেকটাই কমবে বলে মনে করে বঙ্গবন্ধু ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।


জাতনে চাইলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল হক বলেন, ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের পরিবেশ খুবই সুন্দর। এখানে কম টাকায় শতভাগ নিরাপদ পরিবেশে রাত্রী যাপন করতে পারবেন প্রবাসী কর্মীরা। এতে করে যানজটে আটকে পরে প্রবাসীদের ফ্লাইট মিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিক বিমানবন্দর থেকে সেন্টারে যাতায়াতে নিজস্ব মাইক্রোবাস রয়েছে। তবে সেন্টারের সামনের রাস্তায় সংস্কার কাজ চলায় এ বাস সেবা বন্ধ আছে। শিগগির রাস্তার সংস্কার কাজ শেষ হলে মাইক্রোবাস চালু করা হবে। ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার থেকে বিমানবন্দর যেতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট লাগবে। ফলে ফ্লাইট মিস হওয়ার আশঙ্কা নেই।

Make Comment

Login to Comment
Leaving AviationExpress Your about to visit the following url Invalid URL

Loading...
Comments


Comment created.

Related News