বিএনপি, জামায়াতের ইশতেহারে এভিয়েশন, পর্যটন খাত কতটা গুরুত্ব পেল?
সিনিয়র প্রতিবেদক
| Published: Saturday, February 07, 2026
কোলাজ: এভিয়েশন এক্সপ্রেস
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এভিয়েশন ও পর্যটন খাত নিয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। দুই দলই দেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
হাব-কেন্দ্রিক, অবকাঠামো-নির্ভর দৃষ্টি বিএনপির
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত ইশতেহারে বলা হয়, এই দল ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার শীর্ষ এভিয়েশন হাবে রূপান্তর করবে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশজুড়ে জাতীয় এয়ার কানেক্টিভিটি গ্রিড তৈরির পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়। প্রথম ধাপে বিভাগীয় শহরগুলোর সাথে আকাশপথে সংযোগ বাড়াতে ছোট আকারের বিমানবন্দর বা রানওয়ে (এয়ারস্ট্রিপ) বানানো হবে। পরবর্তী পর্যায়ে জেলা সদর পর্যন্ত আকাশপথ সম্প্রসারণ করা হবে।
দলের ইশতেহারে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ যাত্রী ও লজিস্টিকস হাবে উন্নীত করার কথা বলা হয়। কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক গেইটওয়েতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতিও দেয় বিএনপি। পাশাপাশি কার্গো ট্র্যাকিং, বুকিং ও রুট পরিকল্পনার জন্য জাতীয় লজিস্টিকস ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর কথা জানানো হয়। বিমানবন্দরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করার বিষয়টিও ইশতেহারে উল্লেখ করেন তারা।
জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পরিচালন কাঠামো, রুট ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান সংস্কারের অঙ্গীকার করে বিএনপি। আন্তর্জাতিক রুটে প্রবেশ বাড়াতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্প্রসারণের কথাও বলেন তারা। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ দিতে নীতিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন।
এভিয়েশন শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের কথাও জানিয়েছে বিএনপি। দেশীয় এভিয়েশন খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন তারা। একই সঙ্গে দেশের সব বিমানবন্দরে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও হয়রানিমুক্ত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টিকিট কালোবাজারি, প্রতারণা ও অবৈধ অর্থ আত্মসাৎ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেন তারা।
পর্যটন খাত নিয়ে বিএনপির ইশতেহারে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা হালনাগাদ করে বাংলাদেশকে পর্যটনবান্ধব দেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। পর্যটন কেন্দ্র ও প্রবেশপথগুলোকে পরিষ্কার, সুশৃঙ্খল ও সেবামুখী করার কথা বলা হয়। বিদেশি পর্যটকদের জন্য একক অনলাইন পোর্টাল ও মোবাইল অ্যাপ চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে করে হোটেল বুকিং, ভিসা সংক্রান্ত সহায়তা, গাইড সেবা, ভাষা অনুবাদ ও নিরাপত্তা বিষয়ক তথ্য সহজেই পাওয়া যাবে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত ট্যুরিস্ট পুলিশ নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। তাদের ইশতেহারে পরিবেশ ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করে ইকো ট্যুরিজম উন্নয়নের পাশাপাশি কমিউনিটি ট্যুরিজম, নৃ-গোষ্ঠীভিত্তিক পর্যটন এবং জলভিত্তিক পর্যটন চালুর কথাও রয়েছে।
বিএনপি প্রতি বছর ঢাকা ফুড অ্যান্ড কালচার ফেস্টিভ্যাল আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। এতে স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, বাবুর্চি ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা অংশগ্রহণ করতে পারবেন। দলটি দেশের স্বাদ ও সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে বিশ্বে পরিচিত করার লক্ষ্য নিয়েছে। পর্যটন এলাকাগুলোতে স্মার্ট ট্যুর গাইডকে তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও লাভজনক পেশা হিসেবে গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
জামায়াতের কম খরচের প্রতিযোগিতামূলক এভিয়েশন খাতের প্রতিশ্রতি, গুরুত্ব হালাল পর্যটনে
অন্যদিকে ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর এক হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামী তাদের এভিয়েশন ও পর্যটন খাত নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানায়।
দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিমানবন্দরের কর ও চার্জ কমিয়ে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক এভিয়েশন যোগাযোগ কেন্দ্রে পরিণত করা হবে।
জামায়াত সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। উত্তরাঞ্চলের সংযোগ জোরদারে বিএনপিও একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াতও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের অঙ্গীকার করেছে। এ ক্ষেত্রে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, বাজারে অংশীদারত্ব বাড়ানো, উড়োজাহাজের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আর্থিক শক্তি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
তাদের ইশতেহারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোকে আঞ্চলিক রিফুয়েলিং সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়। বিদেশি এয়ারলাইন্স আকর্ষণে বিমানবন্দরের শুল্ক কমানো এবং সকল এভিয়েশন সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় সেবামান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত।
পর্যটন খাতে জামায়াত নদীভিত্তিক ও হালাল পর্যটন উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছে। দলটি হোটেল, রিসোর্ট, পার্ক, বিনোদন কেন্দ্র ও শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার কথা জানিয়েছে।
উভয় রাজনৈতিক দলই এভিয়েশন খাতকে অর্থনৈতিক সংযোগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখছে। তবে, বিএনপির নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং জাতীয় এয়ার কানেক্টিভিটি গ্রিড তুলনামূলকভাবে কাঠামোবদ্ধ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে জামায়াতের বিমানবন্দরের কর কমিয়ে বিদেশি এয়ারলাইন্স আকর্ষণের কৌশলকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তর করতে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নীতিগত সংস্কার এবং সিঙ্গাপুর, দুবাই ও কুয়ালালামপুরের মতো প্রতিষ্ঠিত হাবগুলোর মতো প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যটন খাতে এই দুই দলের ইশতেহার বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।