বিমানের বোয়িং কেনা নিয়ে প্রশ্ন: বানিজ্যিক নাকি ভূ-রাজনৈতিক?
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Monday, January 19, 2026
ফাইল ছবি
বিমান
বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে (বিমান) ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত অনুমোদন দেয় সরকার।
এরপর থেকেই দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বাণিজ্য
খাতে কি কূটনীতিকে অগ্রাধিকার হয়েছে? নাকি বাণিজ্যিক সক্ষমতা ও বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায়
রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোই করা হচ্ছে বিমানকে।
সরকারের
একাধিক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক ও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ ঐ দেশেই
তৈরি উড়োজাহাজ কেনার সাথে সরাসরি যুক্ত থাকায়
বিতর্ক আরও জোরালো হয়।
সরকারের
এই সিদ্ধান্ত নেওয়াতে এদেশে বোয়িং ও এয়ারবাসের মধ্যে প্রায় তিন বছর ধরে চলা প্রতিদ্বন্দ্বিতার
বিষয় আবারও সামনে চলে এসেছে। আগের সরকার বহর সম্প্রসারণ করার জন্য অতিরিক্ত ওয়াইডবডি
উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করলেও সে সময় এয়ারবাস কেনা নিয়েই আলোচনা চলছিল। কিন্তু বর্তমানে
বিমান বহরের বড় অংশই বোয়িং উড়োজাহাজ দিয়ে সাজানো।
গতবছরের
৩০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান প্রকাশ্যে উড়োজাহাজ কেনার
ও বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয় দুইটি একসাথে তুলে ধরেন।
তিনি
বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যেসব পণ্য কেনা হবে তার তালিকায় বোয়িংয়ের
উড়োজাহাজ স্থান পাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বোয়িং থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনা হবে।
খাত
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য সচিবের এই বক্তব্য থেকেই বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ
অর্ডার করার পেছনের দুই ধরনের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে বুঝা গেছে। তা হলো, একদিকে যেমন
বিমান বহর সম্প্রসারণ করতে হবে তেমন অন্যদিকে কৌশলগত বাণিজ্যিক সম্পর্কও রক্ষা করতে
হবে।
গত ৩০
ডিসেম্বর বিমানের বার্ষিক সাধারণ সভায় নীতিগতভাবে উড়োজাহাজ কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রনায়লের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭ টেন, দুইটি ৭৮৭ নাইন এবং চারটি ৭৩৭ এইট ম্যাক্স
উড়োজাহাজ। তবে এগুলো কত দামে কেনা হবে, লেনদেন কীভাবে হবে এবং কখন সরবরাহ করা হবে সেসব
বিষয়ে এখনও চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এদিকে
এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাণকারী
প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস। ঢাকায় সাম্প্রতিক সফরে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট
ওউটার ভ্যান ভার্শ বলেন, বিমানের উচিত তথ্যভিত্তিক, বাণিজ্যিক ও কারিগরি সক্ষমতা বিবেচনা
করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। তার মতে, প্রস্তাবের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার, রাজনীতির
ভিত্তিতে নয়।
তিনি
আরও দাবি করেন, এয়ারবাসের এ থ্রি ফিফটি মডেলের উড়োজাহাজ ব্যবহার করলে ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে
সরাসরি ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হতে পারে। একই সাথে আসনপ্রতি খরচ কমবে এবং কার্গোতে মালামাল
বহনের সক্ষমতাও তুলনামূলক হারে বাড়বে।
নভেম্বর
মাসে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়। সে সময় ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের
রাষ্ট্রদূতরা একসঙ্গে ঢাকায় উপস্থিত হয়ে এয়ারবাসের পক্ষে অবস্থান নেন। ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত
জঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেন, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য বাস্তবায়নে এয়ারবাস
বিশ্বাসযোগ্য ও টেকসই বিকল্প হতে পারে।
জার্মান
রাষ্ট্রদূত রুডিগার লোটজ বলেন, দ্রুত সম্প্রসারণশীল অর্থনীতির জন্য আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব
উড়োজাহাজ প্রয়োজন। ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক পুনরায় এয়ারবাসের প্রতি যুক্তরাজ্যের সমর্থনের কথা
তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
অপারেশনাল
দিক থেকে বোয়িংয়ের কিছু বাস্তব সুবিধাও রয়েছে। বিমানের বিদ্যমান বহরের বেশিরভাগই বোয়িং
হওয়ায় পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ করা ও সেগুলোর যন্ত্রাংশ দেখাশোনা করার পেছনে অতিরিক্ত খরচ তুলনামূলক
কম হয়।
তবে
সমালোচকদের প্রশ্ন, কূটনৈতিক পর্যায়ে এত উচ্চমাত্রার সমর্থন থাকা সত্ত্বেও কেন এয়ারবাসের
প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হলো না। আগের সরকার যেখানে প্রকাশ্যে এয়ারবাসের ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ
কেনার কথা বলেছিল, সেখানে আলোচনা ভিন্ন দিকে কেন চলে গেল সেই প্রশ্নও উঠছে।
বিশ্লেষকদের
মতে, শুধু কূটনৈতিক কারণে সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে ব্যয় ও সক্ষমতার সমস্যা দেখা দিতে
পারে।
তবে
বিমান কর্মকর্তারা বলছেন, বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি এখনো নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে।
কোনো চূড়ান্ত চুক্তি সই করা হয়নি। দাম নির্ধারণ, লেনদেনের পদ্ধতি এবং উড়োজাহাজ হস্তান্তরের
সময় নিয়েও আলোচনা চলমান রয়েছে।