বিমানের ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট: ভাড়া বাঁচবে ৩০ হাজার
নতুন রুট শেষ করবে ট্রানজিট মনোপলি, কমাবে যাত্রার সময়
সিনিয়র প্রতিবেদক
| Published: Sunday, January 18, 2026
ছবি: এভিয়েশন এক্সপ্রেস
-মোহাম্মদ হাসান পল্লব
দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যয়বহুল ঘুরানো পথ ও দীর্ঘ ট্রানজিট যাত্রার পর বাংলাদেশের যাত্রীদের জন্য সুখবর এনেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এয়ারলাইন্সটি আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে ঢাকা–করাচি রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালু করতে যাচ্ছে। এর ফলে যাত্রীদের খরচ ও অতিরিক্ত সময়—দুটোই সাশ্রয় হবে।
বিমান সূত্র জানা গেছে, এই রুটে একমুখী টিকিটের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ৮৯৯ টাকা। রাউন্ড ট্রিপ টিকিটের দাম শুরু হবে ৫৬ হাজার ৯০৩ টাকা থেকে।
ফলে বর্তমান ট্রানজিট ফ্লাইটের তুলনায় যাত্রীরা অন্তত ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারবেন। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন হাব হয়ে ইকোনমি ক্লাসে ফিরতি টিকিটের দাম পড়ছে ৮৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
সরাসরি রুটে ভাঙবে ট্রানজিট ভাড়ার ফাঁদ, যাত্রা হবে সহজ
পাকিস্তানে সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের দুবাই, দোহা বা শারজার মতো শহর হয়ে ট্রানজিট যাত্রা করতে হয়েছে। এতে যাত্রার সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে। যদিও ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইটে সময় লাগার কথা ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা, বর্তমানে যাত্রীরা গড়ে সাড়ে ৮ ঘন্টা থেকে ১৩ ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন। আবার কখনও কখনও এই যাত্রা ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় নিচ্ছে।
ট্রাভেল এজেন্টদের মতে, বিমানের সরাসরি সার্ভিস চালু হলে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য এয়ারলাইন্স এই রুটে প্রবেশ করলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। এতে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের আগে পরীক্ষামূলক পরিচালনা
বিমান সূত্র জানায়, পুনরায় চালু হওয়া ঢাকা–করাচি রুটটি প্রাথমিকভাবে ‘কৌশলগত পর্যবেক্ষণ’ হিসেবে পরিচালিত হবে। ফ্লাইটগুলো ২৯ জানুয়ারি থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত ট্রায়াল ভিত্তিতে চলবে। এই সময়ে যাত্রী চাহিদা, লোড ফ্যাক্টর ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন করা হবে। এসব মূল্যায়নের ভিত্তিতেই রুটটি স্থায়ী করা হবে কি না এবং ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে সর্বশেষ ২০১২ সালে বিমান এই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল। তবে যাত্রী সংকট ও লোকসানের কারণে সে সময় সেবা বন্ধ করা হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, আগের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
যাত্রীর সুবিধা অনুযায়ী সময়সূচি
প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে দুই দিন—বৃহস্পতিবার ও শনিবার—ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। ঢাকা থেকে রাত ৮টায় (বাংলাদেশ সময়) ফ্লাইট ছেড়ে রাত ১১টায় করাচিতে পৌঁছাবে। করাচি থেকে রাত ১২টায় ফ্লাইট ছেড়ে পরদিন ভোর ৪টা ২০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাবে।
বিমানের জনসংযোগ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার বুশরা ইসলাম বলেন, যাত্রীদের সুবিধা বিবেচনায় এমন সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে ট্রানজিট বিঘ্ন ছাড়াই কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। তার মতে, এই সরাসরি সংযোগ শুধু সাধারণ যাত্রীদের নয়, পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
কূটনৈতিক উদারতায় রুট পুনরায় চালুর সুযোগ
ঢাকা–করাচি রুটে বিমান চলাচলের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আলোচনা। এসব আলোচনার পর উভয় দেশ আকাশসীমা ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়, যা সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালুর পথ সুগম করে।
এই রুটের কার্যকারিতা প্রায়ই দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। বিমানের সেবা বন্ধ হওয়ার পর পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস (পিআইএ) কয়েক বছর ঢাকা রুটে ফ্লাইট চালু রাখে। তবে ২০১৫–১৬ সালে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সে সময় অপেশাদার আচরণের অভিযোগে কয়েকজন পিআইএ কর্মকর্তাকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানি এয়ারলাইন্স ধীরে ধীরে সেবা কমিয়ে ২০১৯ সালে ঢাকাগামী সব ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়।
বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা
কূটনৈতিক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা–করাচি রুট পুনরায় চালু হওয়া যাত্রী সুবিধার বাইরেও দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন, বিশেষ করে যারা দ্রুত নমুনা পাঠানো ও সরাসরি বৈঠকের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও সুতা সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র করাচি। সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমবে। পাশাপাশি চামড়া রপ্তানি, কৃষিপণ্য বাণিজ্য এবং ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ও এই রুট সহায়ক হবে। এতে উচ্চ ভাড়া ও দীর্ঘ যাত্রার কারণে যারা সরাসরি লেনদেন এড়িয়ে চলতেন, তারাও উপকৃত হবেন। উদ্যোগটি সফল হলে পারিবারিক ভ্রমণ, ধর্মীয় পর্যটন ও চিকিৎসা ভ্রমণও বাড়বে। পাকিস্তানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি ও তাদের পরিবারের জন্যও এটি বড় স্বস্তি এনে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।