“বাংলাদেশের ভূ-স্বর্গ”
একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Monday, January 12, 2026
ছবি: ওহিদুজ্জামান টিটু
সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, যা মূল ভূখন্ডের সর্বশেষ দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত। কক্সবাজার জেলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে ১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই ক্ষুদ্র দ্বীপটি ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। স্থানীয়ভাবে সেন্টমার্টিনকে “নারিকেল জিঞ্জিরা” নামেও ডাকা হয়।
দূরদূরান্ত থেকে ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে এখানকার অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সমুদ্রের নীল জল, আকাশের অসীম নীলিমা এবং সারি সারি নারিকেল গাছ এই দ্বীপকে এক অনন্য রূপ দিয়েছে।
কিছু মূল তথ্য সেন্টমার্টিনের সম্পর্কে:
-
প্রবাল দ্বীপ: পুরো দ্বীপটি মূলত প্রবাল পাথর ও বালির সমন্বয়ে গঠিত। তাই এর বেলাভূমি অন্যান্য সমুদ্র সৈকতের মতো নরম নয়।
-
আয়তন: দ্বীপটি ছোট, প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
-
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: সাদা বালির সৈকত, স্বচ্ছ জল, বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী এবং প্রবাল প্রাচীর এখানে পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
-
জনজীবন: এখানে কম সংখ্যক স্থানীয় মানুষ বাস করেন যারা মূলত মাছধরা ও পর্যটন-সেবা নিয়ে কাজ করেন।
-
পর্যটন: সেন্টমার্টিনে আসার সবচেয়ে ভালো সময় হলো অক্টোবর থেকে মার্চ, যখন সমুদ্র শান্ত এবং আবহাওয়া অনুকূল।
সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সময়
সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সময় নির্ভর করে আবহাওয়া ও নিরাপত্তার ওপর। প্রশাসন যেহেতু যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়, তার ভিত্তিতেই পর্যটকরা দ্বীপে যেতে পারেন। ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করা যাবে। তবে, নভেম্বর মাসে কেবল দিনে গিয়ে ফিরে আসতে হবে, আর ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাতে থাকার সুযোগ রয়েছে।
সেন্টমার্টিনে যাওয়ার উপায়
ঢাকা বা অন্য জেলা থেকে কক্সবাজার আসা প্রথম ধাপ। ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়া যায় বাস, ট্রেন বা উড়ান পথে। কক্সবাজারে পৌঁছে নুনিয়া ছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে সেন্টমার্টিনের জন্য যাত্রীবাহী জাহাজ ছাড়ে। ডলফিন মোড় থেকে ঘাট পর্যন্ত সিএনজি, অটো রিক্সা বা জীপে যেতে সময় লাগে মাত্র ৪০ মিনিট।
কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন যেতে সময় লাগে ৪–৬ ঘন্টা। জাহাজের মান অনুযায়ী রাউন্ড টিকেটের খরচ ৩,৫০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত। জাহাজ সাধারণত সকাল ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে ছাড়ে, আর বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ফিরে আসে।
সেন্টমার্টিনে থাকার ব্যবস্থা
সেন্টমার্টিনে রাত কাটানোর জন্য রিসোর্ট, হোটেল ও কটেজ রয়েছে বিভিন্ন মানের। ছুটির দিনে গেলে আগেই বুকিং রাখা উত্তম। কিছু জনপ্রিয় রিসোর্টের উদাহরণ:
- ব্লু মেরিন রিসোর্ট: জেটির কাছাকাছি, ডাবল বেডরুম ৫,০০০–১৫,০০০ টাকা।
- প্রাসাদ প্যারাডাইস রিসোর্ট: ১৬টি রুম, ২,০০০–৫,০০০ টাকা।
- নীল দিগন্তে রিসোর্ট: দক্ষিণ বীচে, ১,৫০০–৫,০০০ টাকা।
- প্রিন্স হেভেন রিসোর্ট: উত্তর বীচে, ১,৫০০–৩,৫০০ টাকা।
- দি আটলান্টিক রিসোর্ট: পশ্চিম বীচে, ৩,৫০০–১২,০০০ টাকা।
- ড্রিম নাইট রিসোর্ট: পশ্চিম বীচে, ১,৫০০–৩,৫০০ টাকা।
- সায়রী ইকো রিসোর্ট: দক্ষিণ বীচে, ২,০০০–৬,৫০০ টাকা।
- আরও আছে কোরাল ব্লু, মারমেইড, দীপান্তর, পান্না রিসোর্ট ইত্যাদি।
সেন্টমার্টিনে খাবার
বেশিরভাগ রিসোর্টে খাবারের ব্যবস্থা আছে। প্রায় সব জায়গায় পাওয়া যায় সামুদ্রিক মাছ ও বাংলার বিভিন্ন রান্না। বারবিকিউয়ের সুবিধা অধিকাংশ রিসোর্টে রয়েছে। চাইলে বাজারের হোটেল থেকেও খাওয়া সম্ভব।
বিশেষ খাবারের মধ্যে রয়েছে মিষ্টি নারিকেল, কোরাল, সুন্দরী পোয়া, ইলিশ, রূপচাঁদা, লবস্টার ও অন্যান্য শুঁটকি মাছ। গরমকালে তরমুজও খুব জনপ্রিয়।
- সেন্টমার্টিনে কী করতে পারেন
- পশ্চিম বীচ: সূর্যাস্তের জন্য সেরা।
- পূর্ব বীচ: সুনীল সূর্যোদয়ের দৃশ্য।
- ছেঁড়া দ্বীপ ঘুরা: সাইকেল বা মোটরসাইকেল ভাড়া করে।
- বারবিকিউ ও স্থানীয় খাবার: রাতের আনন্দ বাড়ায়।
- একদিনের স্থানে যাওয়া কষ্টকর হতে পারে, তাই অন্তত এক রাত থাকার পরামর্শ।
- খরচের ধারণা
- ঢাকা থেকে দুই দিনের ভ্রমণের আনুমানিক খরচ (টাকায়):
- বাস (যাওয়া ও আসা) ১,৮০০
- জাহাজ (যাওয়া ও আসা) ৩,৫০০
- স্থানীয় যাতায়াত ২০০
- অন্যান্য খরচ ৫০০
- খাবার (২ দিন) ১,২০০–২,০০০
- থাকার খরচ (স্ট্যান্ডার্ড রিসোর্ট) ২,০০০–৪,০০০
- মোটামুটি খরচ: ৮,২০০–১১,২০০ টাকা।
ভ্রমণ পরামর্শ
- সেন্টমার্টিন প্রকৃতির একটি অমূল্য সম্পদ, তাই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
- মোবাইল নেটওয়ার্ক সবসময় ভালো থাকে না, তবে টেলিটক তুলনামূলক ভালো।
- বিজিবি দ্বীপে নিয়মিত টহল দেয়; রাত ১২টার পর বীচে থাকবেন না।
- প্লাস্টিক, পলিথিন এবং আবর্জনা সৈকতে ফেলবেন না।
- কম খরচে যেতে চাইলে ছুটির দিনগুলো এড়িয়ে চলুন।
- দরদাম করতে ভুলবেন না।
- আগেই জাহাজ এবং রিসোর্ট বুকিং দিয়ে ঝামেলা এড়ানো যায়।
সেন্টমার্টিন ভ্রমণ একটি মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা। সমুদ্রের নীল জল, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত, তাজা সামুদ্রিক খাবার এবং প্রশান্তি। সবকিছু মিলিয়ে এটি ভ্রমণপ্রিয় মানুষের জন্য এক স্বর্গ।