লাগেজ ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হলেও বছরে ৬৩০ কোটি ডলার ক্ষতি এয়ারলাইনগুলোর
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Monday, July 06, 2026
ছবি: সংগৃহীত
এভিয়েশন খাতে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও ‘মিস হ্যান্ডেলড’ বা ভুলভাবে পরিচালিত লাগেজের কারণে প্রতি বছর বিশ্বের বিমান সংস্থাগুলোর প্রায় ৬৩০ কোটি (৬.৩ বিলিয়ন) ডলার ক্ষতি হচ্ছে।
বিমান শিল্পের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিটা (SITA)-এর সর্বশেষ ব্যাগেজ আইটি ইনসাইটস প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সিটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ডেভিড লাভোরেল বলেন, যেখানে বিমান শিল্পে যাত্রীপ্রতি গড় নিট মুনাফা মাত্র ৮ ডলার, সেখানে লাগেজ ভুল ব্যবস্থাপনার আর্থিক প্রভাব অত্যন্ত বড়। তাঁর ভাষায়, একটি ‘মিস হ্যান্ডেলড’ ব্যাগের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ৩০টিরও বেশি আসনের টিকিট বিক্রির মুনাফা প্রয়োজন হয়। মাত্র পাঁচটি ভুলভাবে পরিচালিত লাগেজ একটি পুরো ফ্লাইটের মুনাফা পর্যন্ত মুছে দিতে পারে।
সিটার হিসাবে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বিমান শিল্পের মোট ৪১ বিলিয়ন ডলার মুনাফার প্রায় ১৫ শতাংশের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে লাগেজ ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় ‘মিস হ্যান্ডেলড’ লাগেজের হার ২৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির সময় বাদ দিলে এটি এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন হার।
প্রযুক্তিতে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন
সিটার মতে, এই অগ্রগতির পেছনে রয়েছে একাধিক প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (IATA) রেজল্যুশন ৭৫৩ অনুযায়ী ব্যাগেজ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় সর্টিং ও ট্রান্সফার সিস্টেম, আরএফআইডি (RFID) ও কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)নির্ভর পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং অ্যাপল এয়ারট্যাগের মতো ভোক্তাবান্ধব ট্র্যাকিং ডিভাইস। এসব প্রযুক্তি যাত্রীদের রিয়েল-টাইমে লাগেজের অবস্থান জানতে সহায়তা করছে।
বিলম্বিত লাগেজেই সবচেয়ে বেশি ব্যয়
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাগেজ বিলম্বই এখনো সবচেয়ে বড় পরিচালনাগত সমস্যা। মোট লাগেজ-সংক্রান্ত ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ বা ৪৪০ কোটি ডলার ব্যয় হয় বিলম্বিত লাগেজ সামাল দিতে।
অন্যদিকে স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়া লাগেজের ঘটনা মোট ঘটনার মাত্র ৪ শতাংশ হলেও, ক্ষতিপূরণ ব্যয় বেশি হওয়ায় এটি মোট ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশের জন্য দায়ী।
কানেক্টিং ফ্লাইটই প্রধান কারণ
সিটার তথ্য অনুযায়ী, লাগেজ বিলম্বের ৩৯ শতাংশের জন্য দায়ী কানেক্টিং ফ্লাইট মিস হওয়া। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৪১ শতাংশ। এছাড়া লোডিং ত্রুটি, টিকিটিং সমস্যা এবং বিমানবন্দর বা শুল্কসংক্রান্ত বিধিনিষেধও উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, এয়ারলাইন, বিমানবন্দর ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলারদের মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান আরও জোরদার করা গেলে এসব সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
লাগেজ ব্যবস্থাপনায় বাড়ছে এআই-এর ব্যবহার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু ব্যাগেজ ট্র্যাকিং নয়, পরিচালনাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফ্লাইট বিঘ্নিত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাগ পুনঃনির্দেশনা, কনভেয়র সিস্টেমের দক্ষতা বাড়ানো, যন্ত্রপাতির সম্ভাব্য ত্রুটি আগেভাগে শনাক্ত করা, লাগেজ পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ এবং যাত্রী ও কর্মীদের তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাঠাতে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।
এয়ারট্যাগে কমেছে স্থায়ীভাবে হারানো লাগেজ
প্রতিবেদনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, ভোক্তাপর্যায়ের ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল।
সিটার ওয়ার্ল্ডট্রেসার (WorldTracer) ব্যাগেজ পুনরুদ্ধার প্ল্যাটফর্মে অ্যাপল এয়ারট্যাগ ও Find My Share Item Location সুবিধা যুক্ত হওয়ার প্রথম বছরেই স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়া লাগেজের হার ৯০ শতাংশ কমেছে।
এছাড়া বিলম্বিত লাগেজ পুনরুদ্ধারের সময় ২৬ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে ২৯টি এয়ারলাইনস ওয়ার্ল্ডট্রেসারের মাধ্যমে অ্যাপলের Find My প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে গুগলের নতুন Find Hub লোকেশন-শেয়ারিং সুবিধাও যুক্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা নিরাপদে তাদের লাগেজের অবস্থান এয়ারলাইনসের সঙ্গে শেয়ার করতে পারবেন।
ইউরোপে ব্যয় সর্বোচ্চ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি ‘মিস হ্যান্ডেলড’ লাগেজের গড় ব্যয়ের দিক থেকে ইউরোপ সবচেয়ে ব্যয়বহুল অঞ্চল। সেখানে প্রতি ব্যাগে গড় ব্যয় ২৯৫ ডলার এবং প্রতি হাজার যাত্রীর মধ্যে ১০ দশমিক ৫টি লাগেজ ভুলভাবে পরিচালিত হয়। এর জন্য জটিল কানেক্টিং নেটওয়ার্ক এবং বিমানবন্দরগুলোর ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করা হয়েছে।
অন্যদিকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভুলভাবে পরিচালিত লাগেজের হার সবচেয়ে কম—প্রতি হাজার যাত্রীর মধ্যে ৩ দশমিক ৪১টি। একই সঙ্গে প্রতি ব্যাগে গড় ব্যয়ও সর্বনিম্ন, ২১০ ডলার। নতুন বিমানবন্দর অবকাঠামো এবং আধুনিক লাগেজ প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করাকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈশ্বিকভাবে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রতি হাজার যাত্রীর মধ্যে লাগেজ ভুল ব্যবস্থাপনার হার ১ দশমিক ৬৫ হলেও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে তা বেড়ে ৯ দশমিক ১২-তে পৌঁছায়। এর মূল কারণ একাধিক সংযোগ ও লাগেজ হস্তান্তর প্রক্রিয়া।
ভবিষ্যতের চাবিকাঠি তথ্য ভাগাভাগি
সিটার মতে, লাগেজ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও পরবর্তী উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হবে পুরো বিমান শিল্পজুড়ে আরও সমন্বিত তথ্য বিনিময়।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান, এআই-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যাত্রীদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য একীভূত করা গেলে লাগেজ ভুল ব্যবস্থাপনা আরও কমবে। একই সঙ্গে এয়ারলাইনগুলোর পরিচালন ব্যয় কমবে, মুনাফা বাড়বে এবং যাত্রীদের আস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।
উল্লেখ্য, সিটা (SITA—Société Internationale de Télécommunications Aéronautiques) বৈশ্বিক বিমান শিল্পের জন্য ডিজিটাল অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ এবং সফটওয়্যারভিত্তিক সমাধান প্রদানকারী একটি বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
সূত্র: অ্যারোস্পেস গ্লোবাল নিউজ