নির্বাচনী উত্তাপে ম্লান শীতকালীন পর্যটন
সিনিয়র প্রতিবেদক
| Published: Sunday, January 18, 2026
ফাইল ছবি
জাতীয় সংসদ
নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। বিদেশী পর্যটকদের দেশে
প্রবেশের নিয়ম কঠিন করা হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে চলতি শীতের পর্যটনে।
চ্যালেঞ্জের মুখে
পড়েছে দেশের পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে নির্বাচন আয়োজিত হবে
বলে বিদেশি পর্যটক ও প্রবাসীরা এদেশে আসার পরিকল্পনা বাতিল করছে বলে জানা গেছে।
উদ্যোক্তারা জানান, এ
খাত পুরোপুরি ধ্বসে পড়বে না। কারণ শীতে লোকজন ঘুরতে যেতে চায়। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক
অস্থিরতা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যায়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারির শুরুতে অনেক পর্যটক থাকলেও
ফেব্রুয়ারিতে ঘুরতে আসার জন্য আগাম হোটেল রুম বুকিংয়ের হার এবার প্রত্যাশার চেয়ে
কম দেখা যাচ্ছে। অনেকেরই পরিবার নিয়ে দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার আগ্রহ কমে গেছে।
গত বছরের তুলনায়
আগাম হোটেল বুকিং করার হার কিছুটা কমেছে। লোকজন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়
তা দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচনের সময়
বাংলাদেশে ঘুরতে আসা নিয়ে সতর্কতা জারি করায় বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা গত মাসের
তুলনায় কমে গেছে।
নির্বাচনের প্রভাব
পড়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে আসাতেও। অন্য সময় শীতে প্রবাসীরা দেশের নানা
প্রান্তে ঘুরে বেড়ালেও এবার ডাকযোগে ভোট দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা থাকার কারণে তাদের
মধ্যে অনেকেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত আপাতত নিচ্ছেন না।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক
হলেই তারা দেশে ফিরতে পারেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে এয়ারলাইনের টিকিট বিক্রি,
হোটেল রুম বুকিংয়ের হার এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবার উপর।
তবে উদ্বেগের মধ্যেও
অভ্যন্তরীণ পর্যটন পুরোপুরি থেমে যায়নি। বেশি পর্যটক পাওয়ার জন্য হোটেল, রিসোর্ট ও
ট্যুর অপারেটররা ২০%-৫৫% পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে। নতুন জামাই-বউ কিংবা পরিবারকে লক্ষ্য
করেই নানা অফার দেওয়া হচ্ছে।
তবে সব জায়গায়
পরিস্থিতি একরকম নয়। কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারি
মুকিম খান জানান, পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সেন্ট মার্টিনে ঘুরতে যাওয়া সীমিত করা হয়েছে।
ফলে কক্সবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে সিলেটের পর্যটন
ব্যবসায়ীদের আয় কমেছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চলমান সংস্কারকাজের কারণে যানজট তৈরি
হয়। ফলে অতিরিক্ত সময় লাগে। এজন্য পর্যটকরাও এদিকে আসার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে।
সিলেট হোটেল অ্যান্ড
গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারি গোলাম কিবরিয়া বলেন, দ্রুত
যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে এই শীতে ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা
রয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স
জানায়, সারা দেশে পর্যটন এলাকাগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রশিক্ষিত সদস্য মোতায়েন করে, ডিজিটাল নজরদারি চলমান রেখে ও নিয়মিত টহল বজায় রেখে
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তবে খাত সংশ্লিষ্টরা
বলছেন, বাস্তবে এলাকা নিরাপদ থাকলেও বিদেশি পর্যটকদের আস্থা কমে গেছে। কারণ তাদের মনে
আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সতর্কতা প্রভাব ফেলেছে।
রয়্যাল বেঙ্গল
ট্যুরসের মালিক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা থাকলেই
বিদেশি পর্যটকদের আস্থা বাড়ে। তখনই আন্তর্জাতিক পর্যটনের প্রকৃত সম্ভাবনা কতটুকু তা
বোঝা যায়।
এই শীতে নদীর আশেপাশের
কিংবা বনঘেরা এলাকায় ঘুরতে যাওয়া জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সুন্দরবনে ঘুরতে যাওয়ার আগ্রহ
অনেকটাই বেড়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৬০টি ক্রুজ নিয়ে শীতকালীন ট্যুর পরিচালনা
করছে ব্যবসায়ীরা। দুই রাত ও তিন দিনের প্যাকেজের মূল্য রাখা হচ্ছে ১০-২০ হাজার
টাকা।
সি পার্ল বিচ
রিসোর্টের চীফ মার্কেটিং অ্যান্ড রেভিনিউ অফিসার এ কে এম আসাদুর রহমান জানান, ডিসেম্বরে সুন্দরবনে ক্রুজে চড়ে ঘোরার জন্য
আগ্রহীরা আগে থেকেই ৯০% বুকিং করে ফেলেন।
হাউসবোটে চড়ে ঘোরাঘুরি
করাও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। শুধু টাঙ্গুয়ার হাওরেই নয়, শীতে লোকজন এইধরনের
বোটে চড়ে পদ্মায় ঘুরে বেড়ায়। জনপ্রতি ৪ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। প্যাকেজ মূল্য ১২
হাজার টাকা পর্যন্ত রাখা হয়। এজন্যই তরুণদের ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে হাউজবোটে
চড়ে ঘুরতে যাওয়া রীতিমতো ট্রেন্ড হয়ে উঠেছে।
সামগ্রিকভাবে দেশের পর্যটন
খাতের ব্যবসা এখন কিছুটা ধীর গতিতে এগোচ্ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মৌসুমের
বাকি সময়ে এ খাতের ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন বলে মনে করছেন
সংশ্লিষ্টরা।