Logo
এয়ারলাইন্স এয়ারপোর্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স পর্যটন হোটেল প্রবাস লাইফস্টাইল কর্পোরেট রেগুলেটরস মুখোমুখি

Aviation Express

ইরান- যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত

পর্যটন খাতে ৩৪০০ কোটি ডলারের ক্ষতির শঙ্কা: অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স

পর্যটন খাতে ৩৪০০ কোটি ডলারের ক্ষতির শঙ্কা: অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স

ফাইল ছবি

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে বৈশ্বিক ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার (৪ হাজার ১৩৬ কোটি টাকারও বেশি) অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।


শনিবার, অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে বলে জানায় ব্রিটিশ দৈনিক পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান।


পত্রিকাটির পরিবহনবিষয়ক প্রতিবেদক গুইন টপহ্যাম জানান, চলমান সংঘাতের মধ্যেও এমিরেটস আংশিকভাবে ফ্লাইট পরিচালনা পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। শনিবারের মধ্যে তাদের যুক্তরাজ্যের পাঁচটি বিমানবন্দরে প্রতিদিন ১১টি ফ্লাইট পরিচালনা করার পরিকল্পনাও রয়েছে। দুবাইভিত্তিক এই এয়ারলাইন প্রায় ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ৭টি বিমানবন্দরসহ মোট ৮৩টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। ভারতের জন্য প্রতিদিন ২২টি ফ্লাইট থাকবে।


বৈশ্বিক ফ্লাইট চলাচল তিনটি বড় উপসাগরীয় হাবের ওপর ঠিক কতটা নির্ভরশীল তা এই সংকটেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। দুবাই, আবুধাবি ও দোহা বিমানবন্দর থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন। এই তিনটি বিমানবন্দর এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা ও ওশেনিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।


টপহ্যাম জানান, এই তিনটি হাব দিয়ে যাতায়াত করা যাত্রীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কানেক্টিং ফ্লাইটের যাত্রী। শুধু দুবাই বিমানবন্দর থেকেই প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যটক বা ট্রানজিট যাত্রী। আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন, যাদের ৭০ শতাংশই ট্রানজিট যাত্রী।


রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপ থেকে পূর্বমুখী অনেক ফ্লাইট আগে থেকেই দক্ষিণ দিকে উপসাগরীয় রুট ব্যবহার করছিল। কিন্তু নতুন করে ঐ অঞ্চলের আকাশসীমা বন্ধ হওয়ায় বৈশ্বিক ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে। এতে থাইল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের যাত্রীরা আটকা পড়েছেন।


ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর ওমান থেকে ঠিকমতো উদ্ধার ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারছে না। অনেক যাত্রী বলেন, আগে যেখানে ট্রানজিট ফ্লাইটে জন্য এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, এখন সেখানে কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে তাই জানা যাচ্ছে না।


এই সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে বাড়তি জ্বালানি তেলের দাম। শুক্রবার (৬ মার্চ) এক ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেঁড়ে হয় ৯০ ডলার (প্রায় ১১ হাজার টাকা)। সংঘাত শুরুর আগে একই তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৭২ দশমিক ৫০ ডলার (প্রায় ৯ হাজার টাকা)।


বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ করা হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। আরব উপদ্বীপ থেকে ইরানকে পৃথক করা এই সরু জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম বেড়েছে। এতে উড়োজাহাজের জ্বালানি তেলের দামও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান আইএজি গত বছর জ্বালানি তেলের পিছনে প্রায় ৬১০ কোটি পাউন্ড (৯৯,৩৬৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা) ব্যয় করেছে। তাদের মোট ব্যয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ হলো এই পরিমাণ অর্থ। আগামী বছর জ্বালানি তেল কেনার জন্য মোট বাজেটের প্রায় ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করে রেখেছে তারা। তবে দাম ওঠা-নামা করায় অনেক এয়ারলাইনই এখন ঝুঁকিতে আছে।


হাঙ্গেরিভিত্তিক এয়ারলাইন উইজ এয়ার জানায়, উপসাগরীয় সংঘাতের কারণে তাদের মুনাফা কমতে পারে। সংঘাত দীর্ঘ হলে এবং তেলের দাম বাড়লে কয়েকটি এয়ারলাইনের রেটিং কমে যেতে পারে বলে জানায় ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো।


এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের বিশ্লেষক রাচেল গেরিশ দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ফ্লাইট পরিচালনায় সমস্যা হয় কি না এবং যাত্রী চাহিদা বদলায় কি না তা তারা পর্যবেক্ষণ করবেন। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ইজি জেট ও রায়ানএয়ার সাধারণত জ্বালানির বাড়তি খরচ যাত্রীদের কাছ থেকে তুলে নেয়। তাই সামনে ফ্লাইটের ভাড়া বাড়তে পারে।


ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উপসাগরীয় বিমানবন্দরগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এখান থেকে ফ্লাইটে উঠে আট ঘণ্টার যাত্রায় নিজ গন্তব্যে ফিরতে পারেন। তবে ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৬ হাজার ৪০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করা খুব একটা সুবিধাজনক মনে করা হয় না। কারণ দীর্ঘ দূরত্বে উড়োজাহাজকে বেশি জ্বালানি বহন করতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যায়। বেশি জ্বালানি নেওয়ার কারণে উড়োজাহাজ ভারী হয়। ফলে জ্বালানি খরচ আরও বাড়ে এবং যাত্রী বা কার্গো কম নিতে হয়। দীর্ঘ আকাশযাত্রায় ক্রু, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য খরচও বেশি হয়। তাই উপসাগরীয় হাবগুলো ব্যবহার করে যাত্রীরা দুই ধাপে ভ্রমণ করলে এয়ারলাইনগুলো বেশি লাভ করতে পারে।


এমিরেটসের পর ইতিহাদও মার্চের ৬ তারিখ সীমিতভাবে উদ্ধার ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দেয়। তবে উপসাগরের পশ্চিমে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কাতারের আকাশসীমা এখনো পুরোপুরি বন্ধ আছে।


এভিয়েশন বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু চার্লটন বলেন, আকাশসীমা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে ভ্রমণের ধরণ স্থায়ীভাবে বদলে যেতে পারে। তিনি বলেন, “যাত্রীরা তখন অন্য পথ খুঁজে নেবে এবং গন্তব্যও পরিবর্তন করবে।”


থাই এয়ারওয়েজ, ক্যাথে প্যাসিফিক বা সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের বিকল্প রুট থাকলেও আসনসংখ্যা সীমিত। আকাশসীমা দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকলে ইস্তাম্বুল বড় হাব হিসেবে নিজের সুযোগ লুফে নিবে। একইভাবে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স বা কেনিয়া এয়ারওয়েজের মতো আফ্রিকান এয়ারলাইনও উত্তর-দক্ষিণ রুটে বেশি যাত্রী পেতে পারে।


গত মাসে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে এমিরেটসের প্রেসিডেন্ট টিম ক্লার্ক বলেন, কোভিড মহামারির পর পাঁচ বছরে তাদের মুনাফা অনেক বেড়েছে। তবে চলমান সংকটের মধ্যে এই প্রবৃদ্ধি টিকে থাকবে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


সাংবাদিক টপহ্যাম জানান, মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনগুলো নিজেদের বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফুটবল স্টেডিয়ামের স্পনসরশিপ, ব্র্যান্ড প্রচারণা এবং নতুন জ্বালানি সাশ্রয়ী উড়োজাহাজ কেনা।


বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে সক্ষমতা কমে গেলে দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইটের ভাড়া বাড়তে পারে। অ্যান্ড্রু চার্লটন মনে করেন, এমিরেটস শেষ পর্যন্ত কম দামের টিকিট বেঁচে আবারও যাত্রীদের আকৃষ্ট করতে পারে। তিনি বলেন, “তারা আগে কম দামে টিকিট দেয়, এরপর ধীরে ধীরে দাম বাড়ায়। অতীতেও এমনটা হয়েছে।”


ইউরোপের অনেক এয়ারলাইন ইতোমধ্যে এশিয়ার রুট কমিয়ে দিয়েছে। ফলে আকাশসীমা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে দ্রুত বিকল্প নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে।


সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।

Make Comment

Login to Comment
Leaving AviationExpress Your about to visit the following url Invalid URL

Loading...
Comments


Comment created.

Related News