সাগরকন্যা কুয়াকাটা: এক সৈকতেই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Saturday, January 10, 2026
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত দিন দিন পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলি ইউনিয়নে অবস্থিত প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকত থেকে একই দিনে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়—যা কুয়াকাটাকে দেশের অন্যান্য সমুদ্র সৈকত থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
পরিচ্ছন্ন বালুকাবেলা, দিগন্তজোড়া নীল আকাশ, সুনীল বঙ্গোপসাগর এবং আশপাশের ম্যানগ্রোভ বন মিলিয়ে কুয়াকাটা পর্যটকদের কাছে ‘সাগরকন্যা’ নামেই বেশি পরিচিত।
সহজ হয়েছে যাতায়াত, পদ্মা সেতু চালুর পর বেড়েছে পর্যটকের সংখ্যা
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর রাজধানী ঢাকা থেকে সড়কপথে কুয়াকাটায় পৌঁছানো এখন অনেক সহজ ও স্বল্প সময়ের ব্যাপার। ঢাকা থেকে প্রায় ২৮০ কিলোমিটার দূরের এই সৈকতে বাসে যেতে সময় লাগে প্রায় ৬–৭ ঘণ্টা।
সায়েদাবাদ, গাবতলী, আবদুল্লাপুর ও আরামবাগ বাস টার্মিনাল থেকে নিয়মিতভাবে সাকুরা পরিবহন, শ্যামলী, হানিফ, গ্রিনলাইনসহ বিভিন্ন পরিবহনের বাস কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। নন-এসি বাস ভাড়া ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা এবং এসি বাস ভাড়া ১১০০ থেকে ১৬০০ টাকার মধ্যে।
নদীপথে ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক যাত্রীরা সদরঘাট থেকে বরিশাল বা পটুয়াখালী হয়ে কুয়াকাটা যেতে পারেন। তবে যাত্রী সংকটের কারণে বর্তমানে লঞ্চ সার্ভিস আগের মতো নিয়মিত নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
থাকা-খাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা
কক্সবাজারের মতো বড় আকারের হোটেল জোন না হলেও কুয়াকাটায় মধ্যম ও স্বল্প বাজেটের পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। সাধারণ মানের হোটেলে ডাবল বেড রুমের ভাড়া ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। আর উন্নত মানের রিসোর্টে থাকতে চাইলে খরচ কিছুটা বেশি পড়বে।
খাবারের দিক থেকেও কুয়াকাটা পর্যটকদের হতাশ করে না। স্থানীয় হোটেল ও রেস্টুরেন্টে দেশীয় খাবারের পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছের নানা পদ পাওয়া যায়। বিশেষ করে জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন ফিশ ফ্রাই মার্কেটে তাজা মাছ দিয়ে বারবিকিউ পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
সমুদ্রের বাইরে আরও যা দেখবেন, প্রকৃতি ও ইতিহাসের মেলবন্ধন
কুয়াকাটা শুধু সমুদ্র সৈকতেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে ঝাউবন, তিন নদীর মোহনা, গঙ্গামতির জঙ্গল, ফাতরার বন, লেবুর চর, শুঁটকি পল্লী এবং লাল কাঁকড়ার জন্য পরিচিত ‘ক্রাব আইল্যান্ড’। পাশাপাশি রয়েছে ঐতিহাসিক কুয়াকাটা কুয়া, সীমা বৌদ্ধ মন্দির, মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দির ও রাখাইন জনগোষ্ঠীর গ্রাম কেরানিপাড়া।
পর্যটকরা মোটরসাইকেল, ইজিবাইক বা ভ্যান ভাড়া করে সহজেই এসব স্থান ঘুরে দেখতে পারেন। সাধারণত এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই কুয়াকাটার গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানগুলো দেখা সম্ভব।
কম খরচে ভ্রমণের সুযোগ
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করলে কুয়াকাটায় থাকা ও যাতায়াত খরচ তুলনামূলক কম পড়ে। পিক সিজন ও ছুটির দিন এড়িয়ে গেলে হোটেল ও যানবাহন ভাড়ায় ছাড় পাওয়া যায়।
গড় হিসাবে একজন পর্যটকের জন্য ঢাকা-কুয়াকাটা যাতায়াত, থাকা, খাবার ও স্থানীয় ভ্রমণ মিলিয়ে দুই দিনে খরচ হতে পারে আনুমানিক ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা।
কুয়াকাটা ভ্রমণ খরচ
ঢাকা টু কুয়াকাটা বাস: ৭৫০টাকা (নন-এসি), ১১০০ টাকা (এসি)
কুয়াকাটা হোটেল: মোটামুটি মানের হোটেলে ডাবল বেড ভাড়া ১৫০০-২০০০ টাকা
মোটর সাইকেল ভাড়া: দুজনের জন্যে, দুই দিন ১০০০-১৫০০ টাকা
সকালের খাবার: দুই দিন দুই বেলা, জনপ্রতি ১০০-২০০ টাকা
দুপুরের খাবার: দুই দিন দুই বেলা, জনপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা
রাতের খাবার: দুই দিনের রাতের খাবার, জনপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা
অন্যান্য খরচ: ৫০০ টাকা
নির্ধারিত এলাকার বাইরে নামতে নিষেধ
কুয়াকাটা টুরিস্ট পুলিশ পর্যটকদের সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছে। নির্ধারিত এলাকা ছাড়া সমুদ্রে নামা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে খাবার, গাড়ি ভাড়া কিংবা অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে দরদাম করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও সহজ যাতায়াত সুবিধার কারণে কুয়াকাটা ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্য হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।