বিতর্কিত চার শর্ত
থার্ড টার্মিনাল ইস্যুতে জাপানের শর্তে নতি স্বীকার বাংলাদেশের
আগামী ১৫ বছর শাহজালালের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে কোন বিমানবন্দরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা যাবেনা
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
| Published: Sunday, November 01, 2026
-প্রতীকী ছবি
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আপত্তি থাকা সত্ত্বেও জাপানি পক্ষের প্রস্তাবিত চারটি বিতর্কিত চুক্তির শর্ত অনুমোদন করেছে সরকার।
একই সঙ্গে শাহজালাল বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে আগামী ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু না করার শর্তেও সম্মত হয়েছে বেবিচক।
এসব সিদ্ধান্ত সরকারের দর-কষাকষির সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং ঢাকাকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের অন্যতম কেন্দ্র বা এভিয়েশন হাবে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
চুক্তির আলোচনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ চারটি শর্ত অনুমোদন করেছে।
তিনি আরও স্বীকার করেছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম শুরু না করার শর্তেও সম্মতি দিয়েছে বেবিচক।
বেবিচকের আপত্তি উপেক্ষা করে সরকারের অনুমোদন
বিতর্কিত চারটি বিষয় হলো—রাজস্ব ভাগাভাগি, বাংলাদেশের আইন পরিবর্তনসংক্রান্ত বিধান, নির্মাণত্রুটির দায় বহনের মেয়াদ এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত প্রয়োগ।
মন্ত্রণালয় এসব শর্ত অনুমোদন করেছে কি না, জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সরাসরি বলেন, ‘হ্যাঁ, মন্ত্রণালয় এগুলো অনুমোদন করেছে।’
সরকারের এই সিদ্ধান্ত বেবিচকের আগের অবস্থান থেকে একটি বড় পরিবর্তন।
এর আগে বেবিচক জানিয়েছিল, সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া এসব শর্ত মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
১৫ বছরের নিষেধাজ্ঞায় এভিয়েশন হাবের স্বপ্নে শঙ্কা
চুক্তির সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী শর্তগুলোর একটি হলো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে আগামী ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে না।
বেবিচকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, কর্তৃপক্ষ এই শর্ত মেনে নিয়েছে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই বিধান নতুন বিমানবন্দর পরিকল্পনা বা নির্মাণ কিংবা সামরিক বিমান স্থাপনা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে না। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে না।
এই শর্তের প্রভাব শুধু তৃতীয় টার্মিনালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বিমানবন্দর উন্নয়ন পরিকল্পনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাত্র একটি রানওয়ে রয়েছে। অন্যদিকে বিমানবন্দরের চারপাশে অপরিকল্পিত ও ঘন নগরায়ণের কারণে নতুন একটি স্বতন্ত্র রানওয়ে নির্মাণের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরের যাত্রী পরিবহন ও সেবাদানের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। কিন্তু শুধু টার্মিনাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রানওয়ের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়।
একটি প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব গড়ে তুলতে পর্যাপ্ত রানওয়ে সক্ষমতা, বেশি সংখ্যক উড়োজাহাজ ওঠানামার সুযোগ, দ্রুত সংযোগব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান বিমান চলাচল সামাল দেওয়ার অবকাঠামো প্রয়োজন।
নতুন রানওয়ে ছাড়া বাংলাদেশ বিপুল বিনিয়োগে আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ করলেও উড়োজাহাজ চলাচলের সক্ষমতাসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারে।
ফলে ঢাকার আশপাশে ভবিষ্যতে আরেকটি বড় বিমানবন্দর গড়ে তোলার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদি বিমান চলাচল পরিকল্পনায় সরকারের জন্য আরও বেশি বিকল্প ও স্বাধীনতা থাকা জরুরি।
রাজস্ব ভাগাভাগিতেও জাপানকে ছাড়
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের বিষয় ছিল রাজস্ব ভাগাভাগি। সম্মত ব্যবস্থা অনুযায়ী, কনসেশন চুক্তির আওতায় সংশ্লিষ্ট রাজস্বের ২৭ শতাংশ পাওয়ার কথা বাংলাদেশের।
তবে বেবিচকের কর্মকর্তা মেহবুব খান নিশ্চিত করেছেন, আংশিক কার্যক্রম থেকে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে উত্তরণের সময় জাপানি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে কম হারে রাজস্ব ভাগাভাগির সুযোগ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘রাজস্ব ভাগাভাগির হার ২৭ শতাংশই থাকছে।’ তবে আংশিক কার্যক্রম চলাকালে এই পূর্ণ হার কার্যকর হবে না বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন।
সাময়িকভাবে রাজস্বের হার কমানো হলেও এর আর্থিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য হতে পারে। বিশেষ করে যাত্রী চলাচলের পরিমাণ, বাণিজ্যিক আয় এবং অন্তর্বর্তী সময়ের মেয়াদের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
চুক্তির আর্থিক প্রক্ষেপণ ও হিসাব প্রকাশ না হওয়ায় বাংলাদেশ এই ছাড়ের বিনিময়ে যথাযথ সুবিধা পাচ্ছে কি না, তা মূল্যায়ন করা কঠিন।
বিমানের কার্যক্রম নিয়েও বিতর্কিত শর্ত
বিতর্কিত আরেকটি শর্তের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
প্রতিষ্ঠানটি একদিকে উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী এয়ারলাইনস, অন্যদিকে বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেও কাজ করে।
মেহবুব খানের ভাষ্য অনুযায়ী, জাপানি কনসোর্টিয়াম বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের জন্য প্রযোজ্য কিছু অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত বিধান প্রতিষ্ঠানটির স্বতন্ত্র এয়ারলাইনস কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে চেয়েছিল।
বেবিচকের ওই কর্মকর্তা দুটি ভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে একই শর্ত প্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেন, কনসেশন চুক্তিতে বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও এয়ারলাইনস হিসেবে উড়োজাহাজ পরিচালনা সম্পূর্ণ পৃথক একটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
পরে জাপানি পক্ষ বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয় এবং মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থান মেনে নেয় বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
অন্য দুটি বিরোধপূর্ণ বিষয় ছিল বাংলাদেশের আইন পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে চুক্তির বিধান প্রয়োগ এবং নির্মাণত্রুটির দায় বহনের সময়সীমা।
আগের প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছিল, জাপানি কনসোর্টিয়ামের চাওয়া বিশেষ আইনি সুরক্ষা এবং নির্মাণত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের সময়সীমা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ ছিল।
মন্ত্রণালয় এসব শর্ত অনুমোদন করলেও চুক্তিতে শেষ পর্যন্ত কী ভাষায় বিধানগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
একক আলোচনায় দুর্বল হয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান?
তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে এককভাবে আলোচনা চালানোর সিদ্ধান্তও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান এর আগে সতর্ক করেছিলেন, বিকল্প কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আলোচনায় না থাকায় বাংলাদেশের দর-কষাকষির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তার মতে, একমাত্র সম্ভাব্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা জাপানি কনসোর্টিয়ামকে নিজেদের অনুকূলে ক্রমাগত আরও সুবিধাজনক শর্ত আদায়ের সুযোগ দিয়েছে।
বেবিচকের প্রাথমিক আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সরকার বিতর্কিত শর্তগুলো মেনে নেওয়ায় সাবেক চেয়ারম্যানের সেই সতর্কবার্তা নতুন তাৎপর্য পেয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনালের অর্থায়ন ও নির্মাণে জাপানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে—জাপানের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে বলেই কি বাংলাদেশ এসব শর্ত মেনে নিচ্ছে, নাকি এর পেছনে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বিবেচনাও কাজ করছে?
এখন পর্যন্ত ভূরাজনৈতিক চাপের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বাণিজ্যিকভাবে এসব ছাড় দেওয়ার যৌক্তিকতা সম্পর্কে সরকারের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। কিন্তু একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশের স্বার্থ এবং বিমানবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থ সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বিমান চলাচল খাতের অগ্রাধিকারের সঙ্গে এক নাও হতে পারে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পথে অগ্রগতি
বেবিচকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনা শেষ হয়েছে। সংশোধিত কনসেশন চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে প্রতিটি ধারা পর্যালোচনার জন্য জাপানি পক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এরপর চুক্তিটি আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নিতে হবে।
আগামী ১৫ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করা কঠিন হতে পারে বলে তিনি স্বীকার করেছেন। তবে নভেম্বরের মধ্যেই চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল বাংলাদেশের বিমান চলাচল অবকাঠামো আধুনিকায়নের একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
কিন্তু টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর বিনিময়ে ভবিষ্যতে দেশের প্রয়োজনীয় নতুন বিমানবন্দর ও রানওয়ে উন্নয়নের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া উচিত নয়।
এই চুক্তির সাফল্য কত দ্রুত স্বাক্ষর হলো, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং প্রকৃত পরীক্ষা হবে—চুক্তির শর্তগুলো আগামী ১৫ বছর এবং তার পরেও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, রাজস্ব সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা কতটা রক্ষা করতে পারবে।