ভুয়া খবর: ‘অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ভিসার প্রমাণপত্রের মানের স্তর কমিয়েছে’
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Saturday, January 10, 2026
ছবি: এভিয়েশন এক্সপ্রেস।
অননুমোদিত ওয়েবসাইট
ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি ছড়ানো হয়েছে যে অস্ট্রেলিয়া চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ভিসা পাওয়ার জন্য জমা দিতে হবে এমন প্রমাণপত্রের মান তৃতীয়
স্তরের বলে ঘোষণা দেয়। তবে অস্ট্রেলিয়ার কোনো সরকারি সূত্র থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা
হয়নি।
অননুমোদিত একাধিক
প্ল্যাটফর্ম জানায়, ঐ দেশের শিক্ষা বিভাগের প্রোভাইডার রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল
স্টুডেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (প্রিজমস) থেকে প্রকাশ করা বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা
যায় যে অস্ট্রেলিয়ার হোম অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশের শিক্ষার্থীর
ভিসা পাওয়ার জন্য জমা দিতে হবে এমন প্রমাণপত্রের মান নিম্ন স্তরের (তৃতীয় স্তর) বলে
ঘোষণা দিয়েছে।
প্লাটফর্মগুলোর লিখিত
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ভিসা পাওয়ার জন্য জমা দিতে হবে এমন প্রমাণপত্রের
মান আগে প্রথম স্তরের বিবেচনা করা হলেও এখন এর মান তৃতীয় স্তরে পৌঁছেছে বলে জানানো
হয়।
ভারত, নেপালের ও ভুটানের
ক্ষেত্রে এ মান ২য় স্তর থেকে ৩য় স্তরে, আর শ্রীলঙ্কার ২য় স্তরে আছে বলে বিবেচনা
করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার হোম
অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ঘেটে দেখা যায়, ৮ জানুয়ারিতে এ বিষয়ে
কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। অফিসিয়াল এভিডেন্স লেভেল পেইজ সর্বশেষ
২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর হালনাগাদ করা হয়। সেখানে কোনো দেশভিত্তিক তালিকা নেই।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি
নীতি অনুযায়ী প্রমাণপত্রের মানের স্তরগুলো দেশভিত্তিক তালিকা হিসেবে প্রকাশ করা হয়
না। প্রতিটি দেশের জন্য প্রমাণপত্রের মানের স্তর অফিসিয়ালি যাচাই করতে ডকুমেন্ট
চেকলিস্ট টুল ব্যবহার করতে হয়। ঐ দেশের শিক্ষা বিভাগ প্রমাণপত্রের মানের স্তর বিভিন্ন
সময়ে পর্যালোচনা করলেও জনসাধারণের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করে না।
তাই প্রমানপত্রের
মানের স্তর কমে গেছে এমন দাবি মূলত বিদেশে উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত পরামর্শ দিয়ে থাকে
এমন ওয়েবসাইটগুলোতে প্রকাশ করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক
মিডিয়া প্লাটফর্মগুলোতে ‘immivisa.com.au’, ‘aussizzgroup.com’ কিংবা ‘thekoalanews’
নামক ওয়েবসাইট থেকে তথ্য নিয়ে যাচাই না করে এমন ভুয়া খবর প্রচার করা হচ্ছে। এ ছাড়া
মাইগ্রেশন এজেন্টদের ব্লগ ও সাধারণ মানুষের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রোফাইলেও এমন
তথ্য ছড়ানো হয়েছে। কোনোটিই সরকারি উৎস থেকে যাচাই করা হয়নি।
উল্লেখ্য, প্রিজমস হলো
অস্ট্রেলিয়ার নিবন্ধিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা।
সাধারণ মানুষ এই সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারে না। তাই দাবিকৃত প্রিজমস বিজ্ঞপ্তি যাচাই
করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের প্রধান
সংবাদ সংস্থাতেও (যেমন বাসস) এ বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধান সংবাদমাধ্যমও এমন কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি।
বোঝা গেছে, বাংলাদেশের
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। কারণ সকল তথ্যই বিদেশে উচ্চশিক্ষা
গ্রহন করার জন্য ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া চলার সময় সেবা দিয়ে থাকে এমন বাণিজ্যিক
স্বার্থযুক্ত কনসালটেন্সি ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটগুলো একে অপরকে
উল্লেখ করে। কিছু ওয়েবসাইট আবার নামহীন ‘অস্ট্রেলিয়ার হোম অ্যাফেয়ার্স মুখপাত্র’-কে
উদ্ধৃত করে, যা যাচাইযোগ্য নয়।
হোম অ্যাফেয়ার্স
ডিপার্টমেন্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে বলা আছে, অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য যে দেশগুলো
থেকে আবেদন আসে কিংবা কমনওয়েলথ রেজিস্টার অব ইনস্টিটিউশনস অ্যান্ড কোর্সেস ফর ওভারসিজ
স্টুডেন্টস-নিবন্ধিত যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলোর নামে দাখিল করা প্রমাণত্রের
মানের স্তর সিমপ্লিফাইড স্টুডেন্ট ভিসা ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী নির্ধারন করা হয়। এতে সরলীকৃত
প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার শর্ত থাকে।
সহজে বলা যেতে পারে,
শিক্ষার্থীরা ভিসার জন্য আবেদন করার সময় নিজ থেকেই লিখিতভাবে জানায় যে তার পড়াশোনার
ও বসবাসের খরচ বহন করার মতো যথেষ্ট আর্থিক সক্ষমতা আছে। এক্ষেত্রে ব্যাংক স্টেটমেন্ট,
স্পনসরের বিস্তারিত কাগজ কিংবা আয় সংক্রান্ত নথিপত্রই প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। এগুলো
সংযুক্ত করে জমা না দিলেও আবেদনকারীকে তার আর্থিক সক্ষমতা সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র জমা
দিতে হয়।
ভিসার জন্য আবেদন করতে
চায় এমন শিক্ষার্থীদের জন্য সঠিক তথ্যের উৎস হলো ডকুমেন্ট চেকলিস্ট টুল, যা এই লিংকে
ক্লিক করে পাওয়া যাবে: immi.homeaffairs.gov.au । হোম অ্যাফেয়ার্সের অফিসিয়াল
চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ করে যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়ান
ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টদের সংস্থা মাইগ্রেশন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অথরিটি (মারা) কর্তৃক
নিবন্ধিত মাইগ্রেশন এজেন্টের সঙ্গে পরামর্শ করেও সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।
তথ্য যাচাইয়ের জন্য
প্রয়োজন অফিসিয়াল ঘোষণাপত্র, বিভিন্ন নিবন্ধিত অস্ট্রেলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের
নিশ্চিতকরণ এবং প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট।
ভুয়া খবর ছড়ানোর
পেছনে মূলত বাণিজ্যিক স্বার্থ থাকে। সময়ের বাড়তে থাকলে সন্দেহ আরও গভীর হয়। কারণ
দাবিকৃত ঘোষণা চলতি বছরের ৮ জানুয়ারির কোনো সরকারি নথিতে নেই। হোম অ্যাফেয়ার্স
ওয়েবসাইট, ফেইসবুক পেইজ ও অফিসিয়াল আর্কাইভেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অস্ট্রেলিয়ায়
পড়াশোনা করতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ভুয়া খবরের ভিত্তিতে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ
দেওয়া হচ্ছে। সরকারি উৎসগুলো যাচাইয়ের প্রথম ধাপ। প্রমাণপত্রে মানের স্তর যাই হয়ে থাকুক
সম্পূর্ণ নথিপত্র প্রস্তুত রাখাটা জরুরি। ‘মারা’ নিবন্ধিত এজেন্টের কাছ থেকে
পরামর্শ নেওয়া উচিত। অস্ট্রেলিয়ার হোম অ্যাফেয়ার্স ওয়েবসাইট মনিটর করলেই সঠিক নীতি
পরিবর্তনের খবর জানা যায়।
সঠিক নথি থাকা
শিক্ষার্থীরা প্রমাণপত্রের মানের স্তর পরিবর্তন হলেও সফলভাবে আবেদন করতে পারবে।
মনে রাখতে হবে, দেশটির শিক্ষা বিভাগ জানায়, প্রমাণপত্রের মানের স্তর ব্যক্তিগতভাবে
যাচাই করতে হয়। এটি কখনোই জনসাধারণের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয় না।
সূত্র: অস্ট্রেলিয়ার
হোম অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট ওয়েবসাইট, অস্ট্রেলিয়ান হোম অ্যাফেয়ার্সের অফিসিয়াল
ফেইসবুক পেইজ।