আঞ্চলিক হাবের লক্ষ্য সরকারের, বাস্তবতা পর্যালোচনার দাবি সংশ্লিষ্টদের
বিমান চলাচল খাতে গুরুত্বারোপকে স্বাগত জানালেও বরাদ্দের পর্যাপ্ততা, বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও পর্যটনের সীমিত অংশ নিয়ে প্রশ্ন উদ্যোক্তাদের
বিএনপি সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান পেয়েছে বিমান চলাচল ও পর্যটন খাত। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবের পাশাপাশি বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরের রোডম্যাপও তুলে ধরেছে সরকার।
বাজেটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু, যশোর ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের রানওয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে একটি জাতীয় এয়ার কানেক্টিভিটি গ্রিড গঠন এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে সমন্বিত যাত্রী ও লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার কথাও বলেছে সরকার।
তবে বিমান চলাচল ও পর্যটনকে কৌশলগত খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সংশ্লিষ্ট অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ, বাস্তবায়ন কাঠামো এবং খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার যথেষ্ট কি না।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গুরুত্ব পেল বিমান খাত
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ মফিদুর রহমান বিমান চলাচল খাতের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপকে বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, “বিমান চলাচল খাতে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, জাতীয় বাজেটে এবারই প্রথম খাতটিকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি অবশ্যই উৎসাহব্যঞ্জক।”
তবে তাঁর মতে, বাজেটে অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি প্রস্তাব এখনো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রাথমিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়নি।
বাজেটে রাজশাহী, কক্সবাজার, যশোর ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক গেটওয়েতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু মফিদুর রহমানের মতে, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজন বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ভূমি অধিগ্রহণ এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ।
তিনি বলেন, “বর্তমানে এসব বিমানবন্দরের অধিকাংশেরই আন্তর্জাতিক মানের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত সক্ষমতা নেই। শুধু ভূমি অধিগ্রহণেই বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে।”
তাঁর মতে, নতুন আন্তর্জাতিক গেটওয়ে প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি চালু করা এবং সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের চলমান উন্নয়নকাজ দ্রুত সম্পন্ন করা।
তিনি আরও বলেন, “প্রথম ধাপে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য বরাদ্দ রাখা হলে সেটি আরও বাস্তবসম্মত হতো। প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন সম্পন্ন না করেই একাধিক বিমানবন্দরকে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে ঘোষণা করায় বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।”
নীতিগত সহায়তা চায় বেসরকারি বিমান সংস্থা
বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো বিমান চলাচল খাতে সরকারের মনোযোগকে স্বাগত জানালেও তাদের অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলের প্রধান চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও বাজেটে বেসরকারি খাতের চ্যালেঞ্জগুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এয়ারলাইন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) মহাসচিব মফিজুর রহমান বলেন, বাজেট আলোচনায় বেসরকারি খাতের সমস্যাগুলো প্রায় অনুপস্থিত ছিল।
তিনি বলেন, “দেশীয় বিমান চলাচল খাতের প্রায় ৮০ শতাংশ কার্যক্রম বেসরকারি খাত পরিচালনা করে। অথচ বেসরকারি এয়ারলাইনগুলোর সমস্যার কোনো সুস্পষ্ট প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি।”
তিনি কয়েকটি বিমানবন্দর উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
মফিজুর রহমান বলেন, “কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এমন বিমানবন্দর আছে, যেগুলো এখনো অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। সেগুলো কীভাবে আন্তর্জাতিক গেটওয়েতে পরিণত হবে, সেই প্রশ্ন থেকে যায়।”
শুধু অবকাঠামো দিয়ে হাব হওয়া সম্ভব নয়
বিমান চলাচল বিশ্লেষক এটিএম নজরুল ইসলাম মনে করেন, বাজেটে ভৌত অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অথচ টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বৃহত্তর এভিয়েশন ইকোসিস্টেমের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত রয়েছে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজারের ২০ শতাংশেরও কম এবং কার্গো বাজারের মাত্র ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই বাস্তবতা পরিবর্তন না হলে জিডিপিতে বিমান চলাচল খাতের অবদান সীমিতই থাকবে।”
নজরুল ইসলামের মতে, দুবাই, দোহা ও সিঙ্গাপুরের মতো সফল এভিয়েশন হাব শুধু বিমানবন্দর নির্মাণের মাধ্যমে গড়ে ওঠেনি। বরং শক্তিশালী এয়ারলাইনস, আধুনিক কার্গো অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র এবং সহায়ক নীতিমালার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে এখনো বিশ্বমানের মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল (এমআরও) সুবিধা গড়ে ওঠেনি। শুধু বিমানবন্দর নির্মাণ করে এভিয়েশন অর্থনীতি তৈরি করা যায় না।”
তাঁর মতে, বিমানের বহরে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেটি এককভাবে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে পারবে না।
পর্যটন বরাদ্দ নিয়ে অসন্তোষ
পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এবারও মোট বরাদ্দের খুব সামান্য অংশ সরাসরি পর্যটন উন্নয়নে ব্যয় হবে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক পরিচালক (ট্রেড এন্ড ফেয়ার) ড. মো. তাসলিম আমিন (শোভন) বলেন, খাতটির সম্ভাবনার তুলনায় বরাদ্দ যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, “এটি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত। কিন্তু বরাদ্দের পরিমাণে সেই অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়নি।”
তিনি ধারণা করেন, মোট বরাদ্দের ৯০ শতাংশেরও বেশি বিমান চলাচল অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হবে। ফলে পর্যটন প্রচার, গন্তব্য উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বিপণনের জন্য সীমিত অর্থ অবশিষ্ট থাকবে।
জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার সরকারি লক্ষ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, “পাঁচ টাকা বিনিয়োগ করে কুড়ি টাকা ফেরত পাওয়ার আশা করা যায় না। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও সুপরিকল্পনা ছাড়া এ ধরনের লক্ষ্য কেবল কাগজেই থেকে যাবে।”
পর্যটনে ইতিবাচক বার্তাও দেখছেন অনেকে
অর্থ বরাদ্দ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি নীতিগত অঙ্গীকারকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টরা ।
পাটা বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব তৌফিক রহমান বলেন, আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার পর্যটন খাত বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি বলেন, “এগুলো ইতিবাচক সংকেত। সরকার ইনবাউন্ড ট্যুরিজম এবং বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করছে বলে মনে হচ্ছে।”
তাঁর মতে, পর্যটন মহাপরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন হলে খাতটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য একটি কার্যকর রূপরেখা তৈরি হবে।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার মেলবন্ধন
সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করেন, বিমান চলাচল ও পর্যটনকে কৌশলগত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এবারের বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে বিমান চলাচল খাতের ক্ষেত্রে সাফল্য নির্ভর করবে তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালু করা, আন্তর্জাতিক যাত্রী ও কার্গো পরিবহনে বাংলাদেশের অংশ বাড়ানো, এমআরও সুবিধা গড়ে তোলা এবং এয়ারলাইনগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর।
অন্যদিকে পর্যটন খাতের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হবে গন্তব্য উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বিপণন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যটকদের জন্য মনোরম অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ।