টিকিট প্রতারণায় চাপে ট্রাভেল খাত
মাসে ১ হাজার ২০০ কোটির টাকার বেশি লেনদেন হওয়া বাংলাদেশের বিমান টিকিট বাজার এখন তীব্র আস্থার সংকটে পড়েছে। একসময় দ্রুত, সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক টিকিট সেবার জন্য প্রশংসিত অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) খাত এখন একের পর এক আলোচিত প্রতারণার ঘটনায় ভোক্তাদের বিশ্বাস হারাচ্ছে। একই সঙ্গে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের মুখে পুরো শিল্পও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে ফ্লাইট এক্সপার্ট (FEBD)-কে ঘিরে। গত ১৩ জুলাই ২০২৬ অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। তদন্তে উঠে এসেছে, অস্বাভাবিক উচ্চ ছাড়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহক ও সাব-এজেন্টদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ সংগ্রহ করলেও পরে অনেক ক্ষেত্রেই বিমান টিকিট ইস্যু করেনি।
সিআইডির তদন্ত অনুযায়ী, ফ্লাইট এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান বিন রশিদ শাহ সাঈম ২০২৫ সালের আগস্টে কানাডায় চলে যান। এর ফলে বহু যাত্রী, সাব-এজেন্ট ও ব্যবসায়িক অংশীদার ক্ষতির মুখে পড়েন। প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মী পরে গ্রেপ্তার হলেও তারা দাবি করেন, তারা কেবল কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করছিলেন এবং কোম্পানি ধসে পড়ার পর তাদের পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়।
তবে ফ্লাইট এক্সপার্টই একমাত্র নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল এবং ট্রাভেল বিজনেস পোর্টালও হঠাৎ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এতে অসংখ্য গ্রাহক ও ব্যবসায়িক অংশীদার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই তিনটি ঘটনার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার হিসাব এখনও অজানা রয়ে গেছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচারে একাধিক শেল কোম্পানি ও জটিল ব্যাংকিং লেনদেনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে অর্থের গতিপথ অনুসরণ ও পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশের দ্রুত সম্প্রসারিত অনলাইন ট্রাভেল বাজারের ওপরও জনসাধারণের আস্থা কমে গেছে।
এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ট্রাভেল এজেন্সি নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ-২০২৬ জারি করেছে। সরকারের মতে, ভুয়া বুকিং, অস্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ এবং আর্থিক অনিয়ম ঠেকাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
তবে বৈধ ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর একটি বড় অংশ মনে করছে, কয়েকটি অসাধু প্রতিষ্ঠানের অপরাধের দায় এখন পুরো শিল্পকে বহন করতে হচ্ছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ওটিএগুলোর জন্য ১ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে কার্যত দীর্ঘদিনের প্রচলিত বিজনেস-টু-বিজনেস (B2B) টিকিট বিক্রয় ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে ছোট ট্রাভেল এজেন্সিগুলো বড় আইএটিএ-স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টিকিট সংগ্রহ করত।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই বিধিনিষেধের ফলে প্রায় ৫ হাজার নন-আইএটিএ ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ, তাদের সরাসরি এয়ারলাইনের টিকিট ইস্যুর অনুমোদন নেই। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা কমবে, গ্রাহকের বিকল্প সীমিত হবে এবং বড় আর্থিক সক্ষমতা থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজার আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি এবং পরে হঠাৎ কঠোর নীতিমালার ফল। গত এক দশক ধরে ওটিএ খাতে সীমিত নজরদারির কারণে অতিরিক্ত মূল্যছাড়, অস্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ এবং দুর্বল আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়েছিল। ধাপে ধাপে কার্যকর তদারকি ও লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে বড় ধরনের প্রতারণার পর এখন পুরো শিল্পের ওপর একযোগে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
ফলে খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গত এক দশকে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের ডিজিটাল ট্রাভেল ইকোসিস্টেম দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের মতে, ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিতে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন হলেও সংস্কার এমন হওয়া উচিত, যাতে প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিচারের আওতায় আনা যায়, কিন্তু বৈধভাবে পরিচালিত হাজারো ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।