ঐতিহ্যে গড়া ক্যারিয়ার
বাংলাদেশের অব্যবহৃত ঐতিহাসিক স্থানগুলো পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে তরুণ পেশাজীবীদের জন্য খুলে দিতে পারে নতুন এক ক্যারিয়ারের পথ
ছবি: মোয়াজ মাহমুদ
নওগাঁর পাহাড়পুরে বৌদ্ধ বিহারের বিস্তৃত ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে হাঁটুন, কিংবা দাঁড়ান বাগেরহাটের মসজিদ নগরীর ষাটটি পাথর-ইটের গম্বুজের নিচে—আপনি সম্ভবত সেই একই অভিজ্ঞতাই পাবেন, যা আগে আসা লাখো দর্শনার্থী পেয়েছেন: একটি বিবর্ণ সাইনবোর্ড, মুখস্থ তারিখ আওড়ানো একজন গাইড, এবং এসবের গুরুত্ব সম্পর্কে সামান্যই কোনো ধারণা। তিনটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং বৌদ্ধ, ইসলামি ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ঘন এক স্তর নিয়ে বসে থাকা একটি দেশের জন্য এটি একটি বিস্ময়কর ঘাটতি—এবং একই সঙ্গে চোখের সামনে লুকিয়ে থাকা একটি ক্যারিয়ার সুযোগও বটে।
এখানেই আসে হেরিটেজ অ্যান্ড আর্কিওলজি এক্সপেরিয়েন্স কিউরেটরের ধারণা—এমন এক পেশা, যা বাংলাদেশের আতিথেয়তা খাতে এখন প্রায় অস্তিত্বহীন হলেও বিশ্বের অন্যত্র নীরবে রূপ নিচ্ছে। প্রচলিত ট্যুর গাইডের বিপরীতে, একজন কিউরেটরের কাজ শুধু তথ্য আওড়ানো নয়। তার কাজ হলো ইতিহাসের সঙ্গে সাক্ষাতের পুরো অভিজ্ঞতাটি নকশা করা—মহাস্থানগড় পরিদর্শনের সময় এমনভাবে সাজানো যাতে সূর্যের আলো সঠিক সময়ে ধ্বংসাবশেষের ওপর পড়ে, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে স্থানীয় লোককথা মিশিয়ে দেওয়া, সংরক্ষণবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা, এবং সোনারগাঁওয়ের পুরোনো বণিক-বাড়িগুলোর মধ্য দিয়ে হাঁটাকে নিছক দর্শনের বদলে গল্প বলার এক অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়া।
আতিথেয়তা খাতের প্রচলিত মানদণ্ডে এই দক্ষতার সমন্বয় বেশ ব্যতিক্রমী। খানিকটা ইতিহাসবিদ, খানিকটা আতিথেয়তা পরিচালক, খানিকটা লজিস্টিক সমন্বয়ক—কিউরেটরদের প্রয়োজন হয় পর্যাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞান, যাতে তারা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যভাবে কাজ করতে পারেন; পর্যাপ্ত নকশা-বোধ, যাতে অতিথিদের অভিজ্ঞতা সাজাতে পারেন; এবং পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক দূরদৃষ্টি, যাতে এই খাতে বিনিয়োগকারী হোটেল ও রিসোর্টগুলোর জন্য হেরিটেজ ট্যুরিজমকে আর্থিকভাবে টেকসই করে তুলতে পারেন।
এই সুযোগ বাস্তব। কক্সবাজারের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন কৌশল যখন বৈচিত্র্য আনতে চাইছে, তখন ঐতিহাসিক স্থানগুলো এক সুস্পষ্ট অথচ অব্যবহৃত সম্পদ—যেসব স্থান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও দর্শনার্থীদের কাছে এখনও যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করে তুলে ধরা হয় না। একটি হোটেল গ্রুপ যদি একজন নিবেদিতপ্রাণ কিউরেটরের পদে বিনিয়োগ করতে রাজি হয়, তাহলে তা শুধু একটি নতুন চাকরির পদবি যোগ করবে না; বরং বর্তমানে অনানুষ্ঠানিক স্থানীয় গাইড, অসামঞ্জস্যপূর্ণ সাইনবোর্ড ও মুখে মুখে প্রচারের মাধ্যমে টিকে থাকা একটি অভিজ্ঞতাকে পেশাদার রূপ দেবে।
আতিথেয়তা খাতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী তরুণ পেশাজীবীদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় প্রস্তাব: এমন একটি চাকরি, যা একঘেয়েমির বদলে কৌতূহলকে পুরস্কৃত করে, একাডেমিক গভীরতার সঙ্গে অতিথি-কেন্দ্রিক সৃজনশীলতার মিশ্রণ ঘটায়, এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন খাতকে সংজ্ঞায়িত করার আগেই তা গড়ে তোলার বিরল সুযোগ দেয়। বাংলাদেশের কাছে আছে ধ্বংসাবশেষ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কাঁচামাল। যা এখনও নেই, কিন্তু থাকা সম্ভব, তা হলো এমন একজন মানুষ—যার পূর্ণকালীন কাজই হবে এটা নিশ্চিত করা যে, ভ্রমণকারীরা প্রকৃতপক্ষে বুঝতে পারছেন তারা কী দেখছেন।