তিনটি সফর, ফলাফল ‘শূন্য’
তিনটি উচ্চপর্যায়ের মিশনেও মেলেনি বাজার খোলার নিশ্চয়তা, সিন্ডিকেটের প্রত্যাবর্তনের শঙ্কা বাড়ছে
তিনটি উচ্চপর্যায়ের সফর, সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগের বারবার আশ্বাস এবং আগস্টে কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা—এসবের পরও এখনো খোলেনি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এদিকে আশঙ্কা বাড়ছে যে নির্বাচিত কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সি এই লাভজনক বাজারে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হতে পারে।
এপ্রিল থেকে মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা নিয়োগ পুনরায় চালুর আলোচনার জন্য একাধিকবার মালয়েশিয়া সফর করেছেন। তবে আগস্টের অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও নতুন কর্মী পাঠানোর কোনো কার্যকর প্রক্রিয়া এখনো প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদি আমিনের সাম্প্রতিক সফরের পর সরকার আগস্টের শেষ সপ্তাহকে কর্মী পাঠানোর জন্য একটি “বাস্তবসম্মত লক্ষ্য” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
৩০ জুলাই মাহদি আমিন জানান, কুয়ালালামপুর সব খাতে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয়েছে, যেখানে প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকার পাবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)।
কিন্তু চূড়ান্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো ঘোষণা না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য পূরণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
পেছনের দরজা দিয়ে সিন্ডিকেট?
আলোচনার আড়ালে যা ঘটছে, তা নিয়েই বিতর্ক বেশি।
সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে পুনরায় খোলা এই বাজার কোনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। তবে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান আলোচনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মালয়েশিয়ায় জমা দেওয়া ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা থেকে বাছাই করা ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি জড়িত রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা অ্যাভিয়েশন এক্সপ্রেসকে জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে এই এজেন্সিগুলোকে নিয়োগের দায়িত্ব না দেওয়া হলেও মন্ত্রী তাদের “কাজ” চালিয়ে যেতে বলেছেন।
কীভাবে বাছাই হলো ২৫টি এজেন্সি, স্পষ্ট নয়
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, খাত-সংশ্লিষ্টদের বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি।
তিনি অ্যাভিয়েশন এক্সপ্রেসকে বলেন, “এই ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি কীভাবে বাছাই করা হলো, তা আমরা জানি না। মন্ত্রী মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন আমাদের আশঙ্কা—এর বদলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে।”
বায়রার সূত্র আরও দাবি করেছে, পাঁচজন বিএনপি সংসদ সদস্য এবং দলের একজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা তাদের মালিকানাধীন এজেন্সিগুলোও তালিকাভুক্তির চেষ্টা করছে। এই এজেন্সিগুলোর মধ্যে নাম উঠে এসেছে মেটকো এন্টারপ্রাইজ, রূপসা এন্টারপ্রাইজ, এয়ার ওয়ে ইন্টারন্যাশনাল, আলম সন্স লিমিটেড, খন্দকার ওভারসিজ ও সুরমা ইন্টারন্যাশনালের।
তবে এজেন্সিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়েছে কিংবা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে—এমন কোনো তথ্য অ্যাভিয়েশন এক্সপ্রেস স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।
উচ্চ ঝুঁকি, পুরোনো আশঙ্কা
মালয়েশিয়ায় নিয়োগ নিয়ে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতাই এই উদ্বেগের মূল কারণ।
২০২১-২০২৪ সময়কালে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ছিল কর্মীপ্রতি ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কর্মীদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছিল ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত।
এই বিশাল ব্যবধানই স্পষ্ট করে দেয়, মালয়েশিয়ার বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে কতটা বড় অঙ্কের আর্থিক স্বার্থ জড়িত, এবং কেন সীমিতসংখ্যক এজেন্সির হাতে নিয়োগ কেন্দ্রীভূত করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অপরিহার্য।
বিবেচনাধীন তালিকায় থাকা কয়েকটি এজেন্সির মালিক অভিযোগ করেছেন, মালয়েশিয়াভিত্তিক দুই ব্যক্তি তালিকাভুক্ত প্রতিটি এজেন্সির কাছ থেকে ৫০ লাখ মালয়েশীয় রিঙ্গিত দাবি করেছেন।
সক্ষমতার পরীক্ষায় বোয়েসেল
অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ঠেকানোর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে সরকার বোয়েসেলকে সামনে এনেছে। তবে বড় পরিসরে মালয়েশিয়াগামী কর্মী নিয়োগ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামো এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুল হক বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নয়, বরং সম্পদের ঘাটতিই মূল বাধা।
তিনি বলেন, “সরকার যদি আমাদের প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা দেয়, তাহলে আমরা এই কাজ করতে পারব, কারণ নিরাপদে ও স্বল্প ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে।”
এখন সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত। বোয়েসেলের সক্ষমতা না থাকলে তা বাড়ানো যেতে পারে। বেসরকারি রিক্রুটারদের প্রয়োজন হলে, স্বচ্ছ যোগ্যতা-মানদণ্ড ও যোগ্য এজেন্সিগুলোর মধ্যে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতাই হতে পারে বিকল্প পথ।
অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটবে যদি একটি সীমিত নেটওয়ার্কের জায়গায় আরেকটি সীমিত নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, অথচ তাকে সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যবস্থা বলে প্রচার করা হয়।
তিনটি উচ্চপর্যায়ের মিশনের পরও অপেক্ষায় আছেন কর্মীরা। এখন প্রশ্ন শুধু এই নয় যে মালয়েশিয়া কবে বাজার খুলবে—বরং প্রশ্ন হলো, সরকার নিশ্চিত করতে পারবে কি না যে এই বাজার খোলা অভিবাসী কর্মীদের স্বার্থে হবে, নাকি আরেকটি সুবিধাভোগী নিয়োগ চক্রের হাতে চলে যাবে।