৮ দশকের বিমান চলাচল ঐতিহ্য, এখন মাটিতে উপশিরোনাম: নীতিগত শূন্যতা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা
নীতিগত শূন্যতা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও অবহেলায় থমকে গেল বাংলাদেশের প্রাচীনতম পাইলট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান
গত ২৮ জুন বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি অ্যান্ড জেনারেল অ্যাভিয়েশন লিমিটেড (বিএফএ অ্যান্ড জিএ) যখন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (সিএএবি) তহবিলের অভাবে কার্যক্রম স্থগিত রাখার কথা জানায়, তখন তা শুধু আরেকটি সংকটাপন্ন বিমান পরিবহন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ছিল না।
এটি ছিল ১৯৪৮ সাল থেকে চলে আসা একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া—এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ তার বিমান চলাচল খাত সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে এবং ক্রমবর্ধমান বহর পরিচালনার জন্য নতুন প্রজন্মের পাইলট প্রয়োজন হবে।
একাডেমিটির পতনের কারণ খতিয়ে দেখলে উঠে আসে উদ্বেগজনক কয়েকটি বিষয়ের সমন্বয়: দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক অচলাবস্থা, আর্থিক সংকট, সম্পদ বিক্রি করে টিকে থাকার প্রবণতা, পরিচালন ও নিরাপত্তাজনিত ঘাটতি, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—দেশীয় পাইলট প্রশিক্ষণ সক্ষমতা রক্ষা ও উন্নয়নে সুসংগত কোনো জাতীয় নীতির অনুপস্থিতি।
পাইলট তৈরির কারখানা থেকে মাটিতে পড়ে থাকা বিমান
১৯৪৮ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান ফ্লাইং ক্লাব নামে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাব লিমিটেড নাম ধারণ করে এবং ২০০৪ সালে বর্তমান নাম গ্রহণ করে।
কয়েক দশক ধরে এই একাডেমি থেকে ৬০০-র বেশি কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্সধারী, ৩৫০-র বেশি প্রাইভেট পাইলট লাইসেন্সধারী এবং ৫০-র বেশি ফ্লাইট ইনস্ট্রাক্টর তৈরি হয়েছেন, পাশাপাশি ইনস্ট্রুমেন্ট রেটিং ও বিদেশি লাইসেন্স রূপান্তরের সুবিধাও দেওয়া হয়েছে।
একাডেমির আজীবন সদস্য ক্যাপ্টেন আবদুল্লাহ আল ফারুকের হিসাবে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে কর্মরত পাইলটদের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই এই একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, পাশাপাশি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ও নভোএয়ারে কর্মরত পাইলটদের একটি অংশও এখান থেকে প্রশিক্ষিত।
অথচ আজ এই একাডেমির বহর কার্যত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে একটি বিকল সেসনা ১৫২ বিমানে।
এস২-এডিকিউ নামের একটি বিমান রিপোর্ট অনুযায়ী তার প্রপেলার-ঘণ্টার সীমা অতিক্রম করেছে। একটি বিকল্প প্রপেলার সংগ্রহ করা হলেও, ভেতরের সূত্রগুলোর ভাষায় প্রশাসনিক “জটিলতার” কারণে তা এখনো সংযোজন করা হয়নি।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, অবশিষ্ট বিমানটিও বিকল অবস্থায় পড়ে থেকে যথাযথ সংরক্ষণ যত্ন পায়নি।
প্রশাসনিক ভাঙন
সংকটের গভীরে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা।
একসময় বিএফএ অ্যান্ড জিএ পরিচালিত হতো নির্বাচিত সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কমিটির মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত কাঠামোতে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিভক্তির কারণে ২০২০ সাল থেকে কোনো নিয়মিত কমিটি কার্যকর নেই। ব্যবস্থাপনা কার্যত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে একজন অ্যাকাউন্টেবল ম্যানেজার ও একজন সেক্রেটারির মধ্যে।
ক্যাপ্টেন ফারুকের ভাষ্যমতে, কর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে অর্ধেক বেতনে বা নিয়মিত বেতন ছাড়াই কাজ চালিয়ে গেছেন, এই আশায় যে একাডেমি ঘুরে দাঁড়াবে।
এর মধ্যেই ধীরে ধীরে বিক্রি হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সম্পদ।
বারিধারায় একাডেমির মালিকানাধীন আটটি ফ্ল্যাটের মধ্যে পাঁচটি ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। ধানমন্ডিতে প্রায় ৮ কোটি টাকা মূল্যের দুই কাঠা জমিও বিক্রির প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, যার আদর্শভাবে টিউশন ফি ও ফ্লাইং থেকে আয়ের মাধ্যমে টিকে থাকার কথা, তার বারবার সম্পত্তি বিক্রি করে টিকে থাকার চেষ্টা একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে—একাডেমিকে কি সত্যিই রক্ষা করা হচ্ছিল, নাকি ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলা হচ্ছিল?
পতনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তাজনিত ব্যর্থতাও
পরিচালনাগত সংকটের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও।
ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নিয়মিত ফ্লাইং পরিচালনায় বিধিনিষেধ আরোপের পর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম রাজশাহীতে স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু রাজশাহীও এক মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়, যখন ২০১৫ সালে একটি সেসনা ১৫২ বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন শিক্ষার্থী পাইলট তামান্না রহমান ঋদ্ধি।
এস২-এডিআই বিমান সংশ্লিষ্ট আরেকটি ঘটনা নিয়ে এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন কমিটির তদন্তেও একাডেমির সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরে দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে।
এই ধরনের পর্যবেক্ষণকে শুধু আর্থিক সংকটের পরিণতি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফ্লাইট প্রশিক্ষণ স্বভাবতই নিরাপত্তা-সংবেদনশীল একটি বিষয়, এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য কখনোই কঠোর প্রশিক্ষণ মান, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম মেনে চলার বিকল্প হতে পারে না।
মূল্য দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা
প্রাতিষ্ঠানিক এই পতনের নেপথ্যে রয়েছেন এমন সব শিক্ষার্থী, যাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ১০ জন শিক্ষার্থী একাডেমিতে ভর্তি রয়েছেন, এবং তাদের প্রায় ১ কোটি টাকা একাডেমির কাছে আটকে আছে।
কার্যক্রম কতটা স্থবির হয়ে পড়েছে, তা বোঝা যায় ক্যাপ্টেন ফারুকের উল্লেখ করা কিছু ব্যক্তিগত ঘটনায়—২০২০ সালে ভর্তি হওয়া একজন শিক্ষার্থীর একা উড়তে (সোলো ফ্লাইং) সময় লেগেছে ছয় বছর, আবার অন্য কেউ কেউ তিন বছরে মাত্র তিন ঘণ্টা উড্ডয়নের সুযোগ পেয়েছেন।
উচ্চাকাঙ্ক্ষী পাইলটদের জন্য এমন বিলম্ব নিছক অসুবিধার বিষয় নয়। এতে তাদের অর্থ, সময় এবং ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো নষ্ট হয়ে যায়।
জাতীয় নীতি কোথায় ছিল?
বিএফএ অ্যান্ড জিএকে অবশ্যই তার প্রশাসনিক, আর্থিক ও পরিচালনাগত ব্যর্থতার দায় নিতে হবে। তবে এর পতন বাংলাদেশের বিমান চলাচল কাঠামোর একটি বৃহত্তর দুর্বলতাও উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশ আরও এয়ারলাইনস, বিমান, রুট ও আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার চায়। অথচ পাইলট প্রশিক্ষণ—যা এই সম্প্রসারণ ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ ভিত্তি—তা এখনো ভৌত অবকাঠামোর মতো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কাঠামোর আওতায় আসেনি।
বিমান চলাচল বিশ্লেষক ও নিজেও একসময় একটি ফ্লাইং একাডেমির প্রধান নির্বাহী থাকা এটিএম নজরুল ইসলাম এই বন্ধ হয়ে যাওয়াকে বিশেষভাবে বেদনাদায়ক বলে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, “একটি ফ্লাইং একাডেমি শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ভবিষ্যৎ বৈমানিক তৈরির কারিগর, একটি দেশের এভিয়েশন শিল্পের ভিত্তি।”
তার এই উদ্বেগ মূল প্রশ্নটিতেই আঘাত করে—বিমান চলাচল খাত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা একটি দেশ কীভাবে তার প্রাচীনতম পাইলট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে পেশাদারভাবে পুনর্গঠনের সম্ভাবনা যাচাই না করেই ভেঙে পড়তে দেখতে পারে?
একাডেমি কি আবার আকাশে উড়তে পারবে?
বর্তমান কাঠামো ঢেলে সাজিয়ে নতুন নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে ১০ জন আজীবন সদস্য জরুরি সাধারণ সভা আহ্বানের আবেদন জানিয়েছেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—সরকারের পক্ষ থেকে একজন প্রশাসক নিয়োগ, সম্পদ বিক্রির বিষয়ে তদন্ত, সিইও-নেতৃত্বাধীন পেশাদার ব্যবস্থাপনার দিকে গঠনতান্ত্রিক সংস্কার, এবং নতুন বিনিয়োগ।
ক্যাপ্টেন ফারুকের হিসাবে, ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা হলেই—যা মোটামুটি দুটি প্রশিক্ষণ বিমান কেনার জন্য যথেষ্ট—কার্যক্রম পুনরায় শুরুর ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।
এই অঙ্ক আদৌ পর্যাপ্ত কি না, তা স্বতন্ত্র পর্যালোচনার দাবি রাখে। পুনরুজ্জীবন মানে যেন এই না হয় যে, প্রতিষ্ঠানটি ঐতিহাসিক বলেই এর অকার্যকারিতা টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।
তবে স্বচ্ছ মূল্যায়ন ছাড়াই আট দশকের পুরোনো একটি একাডেমিকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে দেওয়াও একইভাবে অদূরদর্শিতার পরিচয় হবে।
বিএফএ অ্যান্ড জিএর এই পতনের শিক্ষা একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বড়—শুধু রানওয়ে আর বিমান দিয়ে বিমান চলাচল খাতের জাতি গড়ে ওঠে না। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যা সেই মানুষদের তৈরি করবে, যারা এসব বিমান ওড়াবেন।