পর্যটন বিকাশে ১৯ হাজার কোটি টাকার ৬০ প্রকল্পের প্রস্তাব
নিজস্ব প্রতিবেদক
| Published: Monday, September 21, 2026
ছবি: ওহিদুজ্জামান টিটু
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং এর বিকাশে করণীয় নির্ধারণে সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনের শৈলপ্রপাত মিলনায়তনে সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনদের নিয়ে ‘বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা এবং এর বিকাশে করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা এবং এর বিকাশে করণীয়’ শীর্ষক সভাটি সোমবার আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনের শৈলপ্রপাত মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার এনডিসি এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জিয়াউল হক হাওলাদার দেশের পর্যটন শিল্প নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সভায় সরকারি ও বেসরকারি স্টেকহোল্ডার এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও তা থেকে উত্তরণের বিষয়ে আলোচনা করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা, সড়ক ও যানবাহন, বিমানবন্দর, নৌবন্দর ও আবাসনসহ মৌলিক অবকাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। তিনি পর্যটন সম্ভাবনাময় কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধা চালু, দক্ষ গাইড তৈরি এবং ঐতিহ্যবাহী ও আঞ্চলিক রন্ধনশৈলীর প্রসারের ওপরও গুরুত্ব দেন।
দেশের পর্যটনের উন্নয়ন ও বিকাশে সংস্কৃতি, স্বরাষ্ট্র, ভূমি, স্থানীয় সরকার, গণপূর্ত, পররাষ্ট্র, পরিবেশ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার বলেন, শুধু পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব। তিনি দেশের পর্যটন আকর্ষণগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি সেখানে আধুনিক সুবিধা চালুর ওপর গুরুত্ব দেন।
নৌপর্যটনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি ঢাকার চারপাশের নৌপথে পর্যটকদের জন্য সার্কুলার ওয়াটারওয়ে চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এর মাধ্যমে পর্যটকরা নদীর সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি নদীর দুই পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা, নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি এবং নদীতীরবর্তী বিভিন্ন ঐতিহ্য উপভোগ করতে পারবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সংযোগ আরও বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের জন্য নীতিসহায়তা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সরকারের বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার বলেন, বর্তমান সরকার পর্যটন খাতের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও পর্যটন খাতের অবদান ৬–৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, AI-ভিত্তিক ট্রাভেল অ্যাপ, দক্ষ ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং জেলা-ভিত্তিক কমিউনিটি ট্যুরিজম, ইকো-ট্যুরিজম ও ওয়াটার ট্যুরিজমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিনি।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন বর্তমানে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তার পাশাপাশি আরও বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। কক্সবাজার, সিলেট, কুয়াকাটা, খুলনা ও বাগেরহাটসহ অন্যান্য পর্যটনসমৃদ্ধ এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন তিনি। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের ক্রিয়েটিভ ইকোনমির আওতায় প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো যেতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান বলেন, দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃতভাবে চিহ্নিত করা করপোরেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রতিক উদ্যোগ। ইতোমধ্যে দেশব্যাপী ১,৪৯৮টি পর্যটন স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনি জানান, এসব স্পটের মধ্য থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে পর্যটন শিল্প থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে ৮–১০ শতাংশ অবদান রাখা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে পর্যটন শিল্পে বর্তমানে কর্মরত প্রায় ২৪ লাখ মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হবে। একই সঙ্গে দেশে একটি সার্কুলার ইকোনমির ভিত্তি তৈরি এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সভায় পাওয়া বিভিন্ন সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান।