Logo
এয়ারলাইন্স এয়ারপোর্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স পর্যটন হোটেল প্রবাস লাইফস্টাইল কর্পোরেট রেগুলেটরস মুখোমুখি

Aviation Express

আইকাও নিরাপত্তা সতর্কতা এড়াতে পারবে বাংলাদেশ?

আইকাও নিরাপত্তা সতর্কতা এড়াতে পারবে বাংলাদেশ?

আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) বাংলাদেশের পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা তদারকি অডিট ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ায় কিছুটা সময় পেয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। তবে বিমান চলাচল খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অতিরিক্ত সময় সমস্যার সমাধান নয়; বরং খাতটির দুর্বলতাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।


আগামী ডিসেম্বরে আইকাও-এর একটি প্রি-অডিট মিশন বাংলাদেশ সফর করবে। সেই মূল্যায়ন থেকেই বোঝা যাবে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা তদারকি মান পূরণে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দেবে দেশটি ‘সিগনিফিক্যান্ট সেফটি কনসার্ন’ (এসএসসি) বা গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগের ঝুঁকিতে রয়েছে কি না।


শুধু অডিট নয়, সক্ষমতার পরীক্ষা

আইকাও অডিটকে সাধারণ পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করা যায় না। এখানে দেখা হয় কোনো দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে বিমান নিরাপত্তা তদারকির জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামো আছে কি না।


অডিটে আইন, বিধিমালা, সাংগঠনিক কাঠামো, কারিগরি নির্দেশনা, জনবলের দক্ষতা, সনদ প্রদান ব্যবস্থা, তদারকি কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাসহ আটটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র মূল্যায়ন করা হয়।


সাবেক বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, অডিট পেছানো মানেই বাংলাদেশ বেশি প্রস্তুত হয়ে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়।


তিনি বলেন, “আইকাও-এর মানদণ্ডও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। আমরা যদি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারি, তাহলে অতিরিক্ত সময় পেয়েও পিছিয়ে থাকতে পারি।”


পরিদর্শক সংকট বড় চ্যালেঞ্জ 

বর্তমানে বেবিচক-এর সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টরের (এফওআই) বা ফ্লাইট পরিদর্শকের ঘাটতি।


সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বেবিচকের অন্তত আটজন পরিদর্শক প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। এর মূল কারণ আর্থিক সংকট।


একজন অভিজ্ঞ পাইলট, যিনি পরিদর্শকের দায়িত্ব পালনে সক্ষম, বাণিজ্যিক এয়ারলাইনে চাকরি করে মাসে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। বিপরীতে বেবিচকে পরিদর্শক হিসেবে ভাতা মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ফলে দক্ষ পাইলটদের অনেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যোগ দিতে আগ্রহী হন না।


বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা যোগ্য পরিদর্শক নিয়োগ ও ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছি।”


মফিদুর রহমানের মতে, একজন ফ্লাইট পরিদর্শক তৈরি করতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তাই এই ধরনের জনবল গড়ে তোলার পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি হওয়া উচিত।


প্রশিক্ষণ স্থগিত, বাড়ছে উদ্বেগ

অডিট প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা জানান, বিদেশ সফরে বিধিনিষেধের কারণে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আটকে আছে।


সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অথচ বিমান নিরাপত্তা তদারকির ক্ষেত্রে নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


পরিদর্শকদের নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক অপারেশন পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সম্পর্কে হালনাগাদ থাকতে হয়।


মফিদুর রহমান বলেন, “আইকাও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা বাড়ানোর প্রত্যাশা করে। কিন্তু অনেক সময় প্রশাসনিক পর্যায়ে এর প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে বোঝা হয় না।” তার মতে, এই মানসিকতাই এখন বড় বাধাগুলোর একটি।


আইনি স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন

জনবল ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বেসামরিক বিমান চলাচল আইন, ২০১৭ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।


অডিট প্রস্তুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বেবিচকের যে মাত্রার স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন, বর্তমান আইন তা পুরোপুরি নিশ্চিত করে না।


আইনের কিছু ধারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের সুযোগ রাখে। অথচ আইকাও চায় নিরাপত্তা ও কারিগরি সিদ্ধান্তগুলো বাহ্যিক প্রভাবমুক্তভাবে নেওয়া হোক।


মফিদুর রহমান বলেন, “আইকাও প্রথমেই আইনি কাঠামো মূল্যায়ন করে। আইনে অবশ্যই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দিতে হবে। আমাদের বর্তমান আইনের কিছু দিক সেই বিবেচনায় প্রশ্নের মুখে রয়েছে।”


বেবিচক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা বাড়াতে এবং চেয়ারম্যানের ক্ষমতা আরও সুস্পষ্ট করতে আইন সংশোধনের একটি খসড়া ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।


এসএসসি পেলে কী হবে?

‘সিগনিফিক্যান্ট সেফটি কনসার্ন’ (এসএসসি) আইকাও-এর সবচেয়ে গুরুতর পর্যবেক্ষণগুলোর একটি। কোনো দেশ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কার্যকর নিরাপত্তা তদারকি করতে ব্যর্থ হলে এই সতর্কতা জারি করা হয়।


এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় না। তবে এর প্রভাব ব্যাপক হতে পারে।


বিদেশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের বিমান চলাচল কার্যক্রমের ওপর বাড়তি নজরদারি আরোপ করতে পারে। এয়ারলাইনগুলো অতিরিক্ত তদারকির মুখে পড়তে পারে। নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব বা কোডশেয়ার চুক্তি করাও কঠিন হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি বিমা কোম্পানি ও বিমান লিজদাতারাও ঝুঁকি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।


মফিদুর রহমানের মতে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে দেশের ভাবমূর্তির।


তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অনেক বিদেশি এয়ারলাইন তাদের কার্যক্রম পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এতে আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্র বা এভিয়েশন হাব হওয়ার লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হবে।”


বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক মান অর্জন করতে না পারার কারণেই এখনও যুক্তরাষ্ট্রে বিমানের সরাসরি ফ্লাইট চালুর সুযোগ তৈরি হয়নি।


একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে

বিমান বিশ্লেষক এটিএম নজরুল ইসলাম মনে করেন, এই অতিরিক্ত সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।


তার মতে, “আইকাও কাউকে ফেল করাতে আসে না। তারা দেখতে চায়, একটি দেশ তার নিজস্ব নিয়মকানুন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছে কি না।”


তিনি বেবিচকের দ্রুত ঘাটতি বিশ্লেষণ, প্রয়োজনীয় পরিদর্শক নিয়োগ, আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ অডিট জোরদারের পরামর্শ দেন। প্রস্তুতির প্রক্রিয়ায় এয়ারলাইন্স, অপারেটর এবং অন্যান্য অংশীজনদেরও সম্পৃক্ত করার কথাও বলেন তিনি।


“এয়ারলাইন্স, অপারেটর ও নিয়ন্ত্রক—সবার সাফল্য বা ব্যর্থতা পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। তাই প্রস্তুতি শুধু বেবিচক সদর দপ্তরে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না,” বলেন তিনি।


সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই

ডিসেম্বরের প্রি-অডিট মিশনকে এখন বাংলাদেশের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই মিশনে আইকাও বাংলাদেশের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে, দুর্বলতা চিহ্নিত করবে এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম সঠিক পথে এগোচ্ছে কি না তা যাচাই করবে।


বেবিচকের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু একটি অডিটে ভালো ফল করা নয়। সংস্থাটিকে প্রমাণ করতে হবে যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সুশাসনের কাঠামো বাংলাদেশের রয়েছে।


শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে, নাকি একটি ‘এড়ানো সম্ভব ছিল’ এমন নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়বে—তার উত্তর নির্ভর করছে অডিট শুরুর আগেই নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর ওপর।

Make Comment

Login to Comment
Leaving AviationExpress Your about to visit the following url Invalid URL

Loading...
Comments


Comment created.

Related News