আন্তর্জাতিক কেবিন ক্রু দিবস আজ
৩১ মে— যে দিনটি মনে করিয়ে দেয়, ৩৫০০০ হাজার ফুট উপর দিয়ে আপনার উড়ে চলাকে নিরাপদ রাখেন কিছু মানুষ।
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Sunday, May 31, 2026
বিমানে উঠে সিটবেল্ট বাঁধার সময় আমরা কজন ভাবি— এই মুহূর্তে আমাদের জীবনটা আসলে কার হাতে? পাইলটের কথা মাথায় আসে। হয়ত বিমানের প্রযুক্তির কথাও। কিন্তু যাঁরা কেবিনে আমাদের পাশে থাকেন— খাবার এগিয়ে দেন, হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেন "চা না কফি?" — তাঁদের কথা ক'জন ভাবি?
প্রতি বছর ৩১ মে আন্তর্জাতিক কেবিন ক্রু দিবস পালিত হয় সেই মানুষগুলোকে মনে করিয়ে দিতে। যাঁরা হাজার ফুট উপরে, মেঘের ভেতর দিয়ে, আমাদের নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছে দেন— প্রতিদিন, প্রতিটি ফ্লাইটে।
শুরুর কথা
আন্তর্জাতিক কেবিন ক্রু দিবস বা ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট অ্যাপ্রিসিয়েশন ডে প্রতি বছর ৩১ মে উদযাপিত হয়। ২০১৫ সালে কানাডার কেবিন ক্রু ইউনিয়নের উদ্যোগে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবসটি পালন করা হয়। যাত্রীদের একটু আরাম দেওয়ার সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ও কঠিন একটি পেশায়।
আজ সেই পেশায় আছেন লাখো মানুষ। বিশ্বের প্রতিটি কোণে, প্রতিটি ভাষায়, প্রতিটি সংস্কৃতিতে।
তাঁরা কি শুধু খাবার পরিবেশন করেন?
একটু ভুল ধারণা আছে আমাদের কেবিন ক্রু মানে অনেকের কাছে— ইউনিফর্ম পরা, হাসিমুখে ট্রলি ঠেলা মানুষ। কিন্তু এই ছবিটা পুরোটা সত্যি নয়।
একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, তাঁরা আসলে প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। খাবার পরিবেশনের আগে তাঁদের শিখতে হয়— বিমানে আগুন লাগলে কী করতে হবে, পানিতে পড়লে কীভাবে যাত্রীদের বাঁচাতে হবে, কেউ হঠাৎ অসুস্থ হলে কীভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে। সিপিআর থেকে শুরু করে সন্ত্রাসী হামলা হলে তার প্রোটোকল— সবই তাঁদের জানতে হয়।
বিমানযাত্রার ইতিহাস থেকে জানা যায়, বহু বিমান দুর্ঘটনায় শুধুমাত্র কেবিন ক্রুর শান্ত মাথা আর দ্রুত সিদ্ধান্তের কারণে বেঁচে গেছেন শত শত যাত্রী। আবার কেবিন ক্রু নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে যাত্রীদেরকে সন্ত্রাসী হামলা থেকে বাঁচিয়েছেন।
আর শুধু নিরাপত্তা নয়— একই সঙ্গে তাঁরা ঝগড়া থামান, ভাষার বাধা পেরোন, কাঁদতে থাকা শিশুকে সামলান, একা-একা উড়তে ভয় পাওয়া বৃদ্ধকে সাহস দেন। এই কাজগুলোর কোনো নাম নেই, হয়ত কোনো আলাদা স্বীকৃতি নেই—কিন্তু প্রতিটি ফ্লাইটে এ গল্পগুলোই বারবার লেখা হয়।
আজ বিশ্ব যেভাবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে
এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের মতো বড়ো সংস্থাগুলো এই দিনে তাদের ক্রু সদস্যদের গল্প সামনে আনছে। কেউ কেউ আয়োজন করছে বিশেষ অনুষ্ঠান, দিচ্ছে পুরস্কার।
আইএটিএ এবং আইটিএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই দিনে মনে করিয়ে দিচ্ছে— ভালো বেতন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা আর নিরাপদ কর্মপরিবেশ এই মানুষগুলোর অধিকার, অনুকম্পা নয়।
বাংলাদেশের মুখ
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও প্রতিটি বিমানবন্দরে প্রতিদিন অনেক ফ্লাইট ওঠানামা করে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার, এয়ার এ্যাস্ট্রা— প্রতিটি বিমানের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন কেউ না কেউ, যাত্রীদেরকে স্বাগত জানাতে।
বিমান বাংলাদেশের ক্রু সদস্যরা দেশের নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শেখেন নিরাপত্তাবিধি, সেবার ধরন, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের সঙ্গে কথা বলার কায়দা। প্রতিটি গন্তব্যে তাঁরা বহন করেন দেশের পরিচয়।
বাংলাদেশের তরুণীদের কাছে এই পেশা এখন অনেক বড়ো স্বপ্নের জায়গা। শুধু চাকরি নয়— এটা একটা জানালা। পৃথিবী দেখার, নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। ইউএস-বাংলা ও অন্যান্য এয়ারলাইন্সগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের ক্রু দল বড়ো করেছে, গড়েছে প্রশিক্ষণের কাঠামো।
এই বিশেষ দিনে অনেক বাংলাদেশি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখছেন— কোনো ফ্লাইটে যে মানুষটা তাঁদের যত্ন নিয়েছিলেন, তাঁর কথা।
পেশাটি শুধু আনন্দভ্রমণ না
বাইরে থেকে কেবিন ক্রুদের জীবনটা যতটা চকচকে দেখায়, ভেতরে ততটাই ক্লান্তিকর।
রাতের ফ্লাইট শেষে ভোরবেলা নামা, আবার দুপুরে উঠে যাওয়া— শরীরের ঘড়ি এলোমেলো হয়ে যায়। গবেষণা বলছে, দীর্ঘদিন এই পেশায় থাকলে বাড়ে কোন কোন ক্যান্সারের ঝুঁকি, ঘুমের সমস্যা, হাড় আর পেশির ব্যথা। সিডিসি এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও বিমানের পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানিয়েছেন।
আর মানসিক চাপের কথা? সেটা আরও অদৃশ্য। যাত্রী রাগ করলে হাসতে হয়। ফ্লাইট দেরি হলে যাত্রীর বিরক্তি সামলাতে হয়। ঘরে কেউ অসুস্থ থাকলেও মুখে হাসি রাখতে হয়।
বাংলাদেশে নারী কেবিন ক্রুদের মাঝে মাঝে শুনতে হয় নানা কথা, সামাজিক নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তবে সময় বদলাচ্ছে, মানুষ বুঝতে শিখছে— এই পেশায় দক্ষতা লাগে, সাহস লাগে, নিষ্ঠা লাগে।
আর অনিশ্চয়তার কথা বলতে গেলে করোনার সময়টার কথা আলাদা সামনে আসে। যখন সারা বিশ্বের আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেল, লাখো কেবিন ক্রু চাকরি হারালেন বা অনিশ্চয়তায় পড়লেন। বাংলাদেশেও বিমান ও বেসরকারি এয়ারলাইন্সের অনেক ক্রু মাসের পর মাস কাটিয়েছেন অপেক্ষায়।
একটু ধন্যবাদ, একটু স্বীকৃতি
তো, পরেরবার যখন বিমানে উঠবেন, তখন ভাবতে হবে যে, দরজার কাছে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর চোখে কিন্তু শুধু সেবার প্রস্তুতি নেই। আছে বছরের পর বছরের প্রশিক্ষণ, আছে হাজারো ফ্লাইটের অভিজ্ঞতা, আছে যে-কোনো বিপদে আপনাকে বাঁচানোর দৃঢ় সংকল্প।
আন্তর্জাতিক কেবিন ক্রু দিবস সেটাই মনে করিয়ে দেয়— এই মানুষগুলো শুধু আকাশের সেবক নন, তাঁরা আকাশের প্রহরী।
তাই পরের বার নিরাপদে নেমে বিমান থেকে বেরোনোর সময় যদি একটু ধন্যবাদ দেন— জানবেন, তাঁরা আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়ার যোগ্য।