বিমান খাতে কম বরাদ্দ; কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন নিয়ে উদ্বেগ বিশেষজ্ঞদের
পরিচালনগত দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন খাতে বাজেট বরাদ্দ গত কয়েক অর্থবছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মন্ত্রণালয়টির জন্য প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ায় বাজেট কমেছে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আর্থিক সহায়তা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে বিমান খাতের সম্প্রসারণ ও পরিচালনগত দক্ষতা ব্যাহত হতে পারে।
বিমান চলাচল বিশ্লেষক এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বাজেট কমে যাওয়ার প্রভাব দেশের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, সরকার প্রায়ই বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার কথা বললেও বর্তমান বাজেটে সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রূপরেখা ও আর্থিক সহায়তার প্রতিফলন নেই।
"এটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। কারণ সরকার বিমান খাত নিয়ে অনেক আশাব্যঞ্জক লক্ষ্য ও পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে," বলেন তিনি।
এটিএম নজরুল ইসলাম আরও বলেন, বৈশ্বিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র হয়ে উঠতে হলে মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার অ্যান্ড ওভারহল (এমআরও) কেন্দ্রের মতো বিশেষায়িত অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান বাজেটে এসব খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।
তার মতে, বাজেটে অবকাঠামো নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও দেশের বিমান খাতের স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি উপেক্ষিত হয়েছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মফিদুর রহমান বলেন, আগের বছরের তুলনায় এবারের বাজেট ‘খুবই সামান্য’।
তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে নতুন কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। ফলে উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
মফিদুর রহমান বলেন, সরকারের ঘোষিত অঙ্গীকারের সঙ্গে বাজেটের বাস্তবতার মিল নেই। "সরকারের প্রতিশ্রুতি বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়," বলেন তিনি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এখন নতুন প্রকল্প হাতে না নিলে ভবিষ্যতে দেশের বিমান খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ আরও বিলম্বিত হবে।
সীমিত বাজেটের কার্যকর ব্যবহার প্রসঙ্গে এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারের উচিত বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ব্যবস্থাপনা কাঠামোর উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া।
তিনি বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালু করা এবং আকাশপথের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটিয়ে বিমান চলাচলের চাপ কমানো।
"নতুন রানওয়ে নির্মাণ স্বল্পমেয়াদে বাস্তবসম্মত নয়। তাই বিদ্যমান রানওয়েটি কীভাবে আরও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে বেশি সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা যায়, সেটিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।"
নজরুল আরও বলেন, দেশের রপ্তানি বাড়াতে কার্গো খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য উন্নত কার্গো সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পর্যটন খাতের ক্ষেত্রে বিদেশি পর্যটকদের সহজে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য বিমানবন্দর থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত (এয়ারপোর্ট-টু-সেন্টার) সংযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার পরামর্শ দেন তিনি।
মফিদুর রহমান বলেন, সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত চলমান সব প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করা, যাতে আরও আর্থিক ক্ষতি এড়ানো যায়। তিনি উল্লেখ করেন, তৃতীয় টার্মিনালের মতো বড় প্রকল্প চালু করতে বিলম্ব হওয়ায় সরকারকে ইতোমধ্যে ঠিকাদারদের জরিমানা গুনতে হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। মফিদুর বলেন, এখনই প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে সেসব জায়গা আবাসিক বা কৃষিজমিতে পরিণত হবে। তখন বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বাজেট তুলনামূলক কম হলেও বিমান খাতে বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করতে এসব গুরুত্বপূর্ণ খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে সংশোধিত বাজেট আনার প্রয়োজন হতে পারে।