২৬০ জনের মৃত্যু
এয়ার ইন্ডিয়া বিমান দুর্ঘটনার এক বছর: কী ঘটেছিল?
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Friday, June 12, 2026
ছবি: এএফপি
আজ (শুক্রবার) ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের আহমেদাবাদ শহরের একটি জনবহুল উপশহরে এয়ার ইন্ডিয়ার মারাত্মক বোয়িং বিমান দুর্ঘটনায় ২৬০ জন নিহত হওয়ার এক বছর পূর্ণ হলো।
দুর্ঘটনার বার্ষিকী উপলক্ষে আজ নিহতদের পরিবারগুলো ঘটনাস্থলে জড়ো হয়েছিল। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই কী কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল, সে সম্পর্কে তারা এখনও উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন প্রকাশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা নিহতদের আত্মীয়দের জন্য হতাশার আরেকটি কারণ। তারা একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশের আশা করছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, ভারতীয় তদন্তকারীরা বিমানের ইঞ্জিনগুলোর বিশ্লেষণ সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে দুর্ঘটনা সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্ব করবে।
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দুর্ঘটনার এক বছরের মধ্যে সম্ভব হলে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। যদি তদন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তবে প্রতিটি বার্ষিকীতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বিবৃতি জারি করতে হয়।
কী হয়েছিল বিমানটির?
এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমান, ফ্লাইট এআই১৭১, যা লন্ডন গ্যাটউইকের উদ্দেশ্যে মাত্র কিছুক্ষণ আগেই উড্ডয়ন করেছিল, সেটি ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আহমেদাবাদের উপকণ্ঠে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে মেঘানি নগরের আবাসিক এলাকার একটি মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের উপর বিধ্বস্ত হয়।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় দুপুর ১:৩৮ মিনিটে (০৮:০৮ জিএমটি) উড্ডয়নের কয়েক সেকেন্ড পরেই বিমানটির চূড়ান্ত সংকেত পাওয়া গিয়েছিল। বিমানবন্দরের বাইরে মাটিতে বিধ্বস্ত হওয়ার আগে এটি ৬২৫ ফুট (১৯০ মিটার) উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
বিমানটি থেকে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঠিক আগে এটি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে একটি ‘মেডে অ্যালার্ট’ পাঠিয়েছিল।
দুর্ঘটনায় কতজন মারা গিয়েছিলেন?
বিমানে থাকা ২৪২ জনের মধ্যে একজন যাত্রী ছাড়া বাকি সবাই নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ১৬৯ জন ভারতীয় এবং ৫২ জন ব্রিটিশ নাগরিক। দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি মাটিতে থাকা ১৯ জনসহ মোট ২৬০ জন নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলের কাছে আরও ৬৭ জন আহত হয়েছেন।
বিমানে থাকা একমাত্র জীবিত ব্যক্তি বিশ্বস কুমার রমেশ একজন ব্রিটিশ নাগরিক, যার ভাই এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার, রমেশের আত্মীয় সঞ্জীব প্যাটেল যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ান পত্রিকাকে জানান যে, এয়ার ইন্ডিয়া রমেশের স্ত্রী ও পাঁচ বছর বয়সী ছেলের ভরণপোষণে সহায়তার জন্য তাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২১,৫০০ পাউন্ড (২৮,৮০০ ডলার) প্রদান করেছে। অন্যান্য পরিবারকেও অনুরূপ অর্থ প্রদান করা হয়েছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।
নিহতদের আত্মীয়রা শুক্রবার আহমেদাবাদে আইনজীবী, বিমান চলাচল ও বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আয়োজিত একটি সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন। সূর্যাস্তের পর তাদের একটি মোমবাতি প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠানের আয়োজন করার কথা রয়েছে।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে কী উঠে এসেছে?
এটি ছিল বিশ্বের প্রথম ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমান দুর্ঘটনা, যা ২০১১ সাল থেকে পরিষেবা দিয়ে আসা বোয়িং-এর একটি মডেল।
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল আইন অনুসারে, দুর্ঘটনার এক মাস পর ভারতের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরো (এএআইবি) একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সেই ১৫-পৃষ্ঠার নথিতে বলা হয়, দুর্ঘটনার ঠিক আগে জেটটির ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যা পাইলটের সম্ভাব্য ভুলের বিষয়ে প্রশ্ন তোলে।
এতে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে ক্যাপ্টেন এবং তার সহ-পাইলটের মধ্যে একটি কথোপকথনও প্রকাশ করা হয় – দুটি সংক্ষিপ্ত বাক্য যা পাইলটের আত্মহত্যার তত্ত্বকে উস্কে দেয়। প্রতিবেদনটি তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়। এতে বলা হয়নি কেন জ্বালানির সুইচগুলো বন্ধ করা হয়েছিল – এটি পাইলটের দোষে হয়েছিল, নাকি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে বোয়িং বা ইঞ্জিন নির্মাতা জিই অ্যারোস্পেসকে কোনো নিরাপত্তা সুপারিশ করা হয়নি, যা থেকে বোঝা যায় যে কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা কী?
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, দুর্ঘটনার এক বছরের মধ্যে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা, কিন্তু কখনও কখনও তদন্তে আরও বেশি সময় লাগে। তাই, যদি তা সম্পন্ন করা না যায়, তবে প্রতিটি বার্ষিকীতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বিবৃতি দিতে হয়। তদন্ত চলমান থাকায়, এই পর্যায়ে এএআইবি শুধুমাত্র একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জারি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান পাইলটস ইউনিয়ন তদন্তকারীদের কাছে বোয়িং এবং এয়ার ইন্ডিয়ার কাছ থেকে বিমানটি সম্পর্কে আরও প্রযুক্তিগত তথ্য চাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে, যাতে এএআইবি দ্বারা খতিয়ে দেখা পাইলটের আত্মহত্যার তত্ত্বটি খণ্ডন করা যায়।
দুর্ঘটনার বার্ষিকীর আগে আহমেদাবাদে একটি জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ইউনিয়নের সভাপতি চরণবীর রান্ধাওয়া সাংবাদিকদের বলেন, “এটি [শুধুমাত্র একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন] আরও জল্পনা এবং ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেবে।”
“আমরা ভারত সরকার এবং ভারতের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরো (এএআইবি)-কে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেছি।”
গত বছর রয়টার্সের প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নের কথা জানানো হয়, যেখানে বলা হয়েছিল যে এয়ার ইন্ডিয়ার ৭৮৭ বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগে এর দুই পাইলটের ককপিটে হওয়া কথোপকথনের রেকর্ডিং থেকে এই ধারণাই পাওয়া গেছে যে ক্যাপ্টেন ইঞ্জিনগুলোতে জ্বালানির সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু এএআইবি তখন বলেছিল, “কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো হয়নি”।
একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে জানিয়েছে, তদন্তকারীরা এপ্রিলে ইঞ্জিন পরীক্ষা চালিয়েছেন এবং ইঞ্জিন ম্যানেজমেন্ট ইউনিট বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে গত মাসে ফ্রান্স সফর করেছেন।
বৃহস্পতিবার ব্লুমবার্গও জানিয়েছে যে, পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো ইঞ্জিনগুলোর গবেষণা শেষ হলেই তিন মাসের মধ্যে এই দুর্ঘটনার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আশা করা যেতে পারে।
ক্যাপ্টেনের বাবা ভারতের শীর্ষ আদালতকে একটি স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দিতে বলেছেন, যেখানে পাইলটের ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ ছাড়া অন্যান্য সম্ভাব্য কারণগুলো খতিয়ে দেখা হবে। পাইলটের ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপকে এর আগেও কয়েকটি প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সন্দেহ করা হয়েছিল এবং ২০১৫ সালে ফরাসি আল্পস পর্বতে বিধ্বস্ত হওয়া জার্মানউইংস ফ্লাইট ৯৫২৫-এর ক্ষেত্রেও তা নিশ্চিত হয়েছিল, যে দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা ১৫০ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন।
সূত্র: আল জাজিরা