জরুরি অবতরণে ব্যাগ নিতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়ছেন যাত্রীরা
প্রয়োজনে জরিমানা বা ওভারহেড বিনে স্বয়ংক্রিয় লক ব্যবস্থার মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা হতে পারে
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Friday, June 12, 2026
ছবি: সংগৃহীত
উড়োজাহাজ জরুরি অবস্থায় অবতরণ করলে যাত্রীদের দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু অনেকেই সেই সময় হ্যান্ড লাগেজ নিতে বা মোবাইলে ভিডিও করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এভিয়েশন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের আচরণ শুধু নিজের নয়, অন্য যাত্রীদের জীবনও ঝুঁকির মুখে ফেলে। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজের জন্য জরিমানার ব্যবস্থাও চালু হতে পারে।
উড়োজাহাজ এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে সব যাত্রীকে নিরাপদে বের করে আনা যায়। কিন্তু যাত্রীরা যদি ওভারহেড বিন থেকে ব্যাগ নামাতে শুরু করেন, তাহলে সেই প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। এতে করিডোর ও বের হওয়ার পথ আটকে যায়, জরুরি স্লাইড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এ কারণে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) ‘ব্যাগ নয়, জীবন বাঁচান’ শিরোনামে একটি নিরাপত্তা সচেতনতা কর্মসূচি শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, আগুন বা অন্য জরুরি পরিস্থিতিতেও যাত্রীরা লাগেজ নিয়ে বিমান থেকে বের হচ্ছেন।
রিও ডি জেনেইরোতে আইএটিএর বার্ষিক সভায় সংস্থাটির পরিচালনা ও নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নিক ক্যারিন বলেন, যাত্রীদের আগে বুঝতে হবে যে জরুরি অবস্থায় ব্যাগ ফেলে রেখে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
তিনি জানান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৬১ শতাংশ যাত্রী জানেন যে জরুরি অবস্থায় হ্যান্ড লাগেজ রেখে যেতে হয়। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় চারজনই এ নিয়ম সম্পর্কে অবগত নন।
জরিমানার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ক্যারিন বলেন, এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তিনি এর পক্ষে। তবে শুরুতে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরে প্রয়োজনে জরিমানা বা ওভারহেড বিনে স্বয়ংক্রিয় লক ব্যবস্থার মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা হতে পারে।
মার্কিন বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (এফএএ) বলছে, জরুরি পরিস্থিতিতে ফ্লাইট ক্রুর নির্দেশ অমান্য করার ঘটনা বাড়ছে। সংস্থাটির প্রশাসক ব্রায়ান বেডফোর্ড বলেন, এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ক্রুদের নির্দেশ মেনে চলতে হবে এবং সব মালপত্র রেখে বিমান ত্যাগ করতে হবে।
যদিও জরুরি অবতরণ বা উড়োজাহাজ খালি করার ঘটনা কম সময়েই দেখা যায়। বছরে গড়ে প্রায় ৩০টি এমন ঘটনা ঘটে। গত বছর যুক্তরাজ্যগামী অন্তত দুটি উড়োজাহাজে আগুনের আশঙ্কায় রানওয়েতেই খালি করা হয়। এর মধ্যে জুলাইয়ে স্পেনের পালমা বিমানবন্দরে একটি রায়ানএয়ারের উড়োজাহাজে জরুরি সরিয়ে নেওয়ার সময় ১৮ জন যাত্রী সামান্য আহত হন। অনেক যাত্রী সেই পরিস্থিতিকে ‘সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল’ বলে বর্ণনা করেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন আচরণের পেছনে মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়াও কাজ করে। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের এভিয়েশন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ব্রেট মোলসওয়ার্থ বলেন, হঠাৎ বিপদের মুখে পড়লে মানুষের ‘লড়াই বা পালাও’ প্রবৃত্তি সক্রিয় হয়ে যায়। তখন বেশিরভাগ মানুষ স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে পারেন না। ফলে অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের ব্যাগটি সঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের জ্যেষ্ঠ অডিটর ড. লেভি ব্রিডিং বলেন, অনেক যাত্রী জরুরি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে উঠতে পারেন না। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কেউ কেউ দ্রুত মোবাইল বের করে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। তাঁর মতে, ভাইরাল ভিডিও বা সংবাদমাধ্যমে ফুটেজ বিক্রির সম্ভাবনাও কিছু মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি অবস্থায় একটি বিষয়ই সবার মনে রাখা উচিত—ব্যাগ নয়, আগে জীবন বাঁচান।
সূত্র: দি গার্ডিয়ান