ভুল পোশাকে ফ্লাইটে উঠলে বিপদ বাড়তে পারে — জানুন কী পরবেন
ডেস্ক রিপোর্ট
| Published: Monday, June 29, 2026
-প্রতীকী ছবি
আকাশপথে ভ্রমণে পোশাক বেছে নেওয়ার সময় বেশিরভাগ যাত্রীর মাথায় থাকে একটাই কথা — আরাম। কিন্তু উড়োজাহাজ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে আপনি কী পরে আছেন, তা হয়তো জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
সম্প্রতি এমিরেটস এয়ারলাইনসের সাবেক এক কর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন — ফ্লাইটে উঠলে শর্টস পরবেন না। এভিয়েশন কর্মীদের মহলে এ পরামর্শ বহু পুরনো হলেও সাধারণ যাত্রীদের কাছে বিষয়টি প্রায় অজানাই থেকে গেছে।
স্লাইড কিন্তু পুড়িয়ে দিতে পারে
আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচল বিধিমালা অনুযায়ী, ৪৪টির বেশি আসনের প্রতিটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজে জরুরি বহির্গমন স্লাইড থাকা বাধ্যতামূলক। এই স্লাইড ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ডেপ্লয় করতে হবে এবং সব যাত্রী ও ক্রুকে ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে উড়োজাহাজ থেকে বের করতে হবে। এই নিয়ম মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফএএ নির্ধারিত, যা বিশ্বের প্রায় সব দেশের এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ অনুসরণ করে।
৯০ সেকেন্ডের এই সীমা নিছক নিয়মের খাতিরে নয়। উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা-পরবর্তী আগুনের ঘটনা বিশ্লেষণ করে় দেখা গেছে, আগুনে আক্রান্ত উড়োজাহাজের কেবিন সর্বোচ্চ দুই মিনিট অবস্থানযোগ্য থাকে — বিশেষজ্ঞরা এটিকে বলেন 'ফ্ল্যাশওভার পয়েন্ট'। তাই স্লাইড এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে যাত্রীরা যত দ্রুত সম্ভব নিচে নামতে পারেন।
কিন্তু এই দ্রুতগতিরই একটি বিপদ আছে। মানবশরীরের উন্মুক্ত অংশের চামড়া স্লাইডের গায়ে লাগলে ঘর্ষণের ফলে মারাত্মকভাবে পুড়ে যেতে পারে। এয়ারবাসের একটি সার্টিফিকেশন পরীক্ষায় দেখা গেছে, ৩৩টি দুর্ঘটনার মধ্যে ৩২টিই ছিল স্লাইড-বার্ন বা ঘর্ষণজনিত পোড়া।
পরিসংখ্যান কী বলছে
মার্কিন ট্রান্সপোর্টেশন রিসার্চ বোর্ডের অধীনে ২০০৮ সালে প্রকাশিত এয়ারপোর্ট কোঅপারেটিভ রিসার্চ প্রোগ্রামের একটি গবেষণায় দেখা যায়, স্লাইড ব্যবহারে আহত হওয়ার হার বছরভেদে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করে, গড়ে যা ৫০ শতাংশ। সামান্য আঘাতের মধ্যে আছে ঘর্ষণজনিত ক্ষত, আঁচড় ও মচকানো। গুরুতর আঘাতের মধ্যে আছে গোড়ালি ভাঙা, পা ভাঙা ও বড় কাটাছেঁড়া।
আহতদের ৮০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে আঘাত 'সামান্য' হিসেবে চিহ্নিত হলেও, জরুরি পরিস্থিতিতে জ্বলন্ত উড়োজাহাজ থেকে দুরে সরতে গিয়ে ঘর্ষণে পোড়া বা মচকানো গোড়ালি নিয়ে ছুটতে হলে তা কতটা কঠিন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
সঠিক কৌশল এবং পোশাকের ভূমিকা
এয়ারক্রাফট নিরাপত্তা প্রশিক্ষকরা যাত্রীদের শেখান, স্লাইডে নামার সময় দুই হাত ভাঁজ করে উরুর ওপর রাখতে হবে। স্লাইডে হাত দিয়ে গতি কমানোর চেষ্টা করলে — যেটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি — হাতের তালু মারাত্মকভাবে পুড়ে যেতে পারে।
শর্টস বা হাফ প্যান্ট পরা থাকলে উরু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত পুরো অংশ স্লাইডের সংস্পর্শে আসে। সুতি কাপড়ের মতো প্রাকৃতিক তন্তুর লম্বা প্যান্ট এ ক্ষেত্রে ভালো সুরক্ষা দিতে পারে।
কিন্তু নাইলন বা পলিয়েস্টারের মতো সিন্থেটিক কাপড় বিপজ্জনক। উড়োজাহাজ নিরাপত্তা পেশাদারদের মতে, নাইলন ঘর্ষণজনিত তাপে গলে চামড়ায় আটকে যায়, যা সাধারণ পোড়ার চেয়ে অনেক বেশি বিপদজনক।
জাপান এয়ারলাইনসের শিক্ষা
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে টোকিওর হানেদা বিমানবন্দরে জাপান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৫১৬ জাপান কোস্টগার্ডের একটি উড়োজাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে আগুনে পুড়তে শুরু করে। এতে ফ্লাইটটিতে থাকা ৩৭৯ জন যাত্রী ও ক্রু সবাইকে সফলভাবে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে জরুরি বহির্গমন প্রস্তুতির গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয় — এবং মনে করিয়ে দেয় যে, যাত্রীরা আকাশযাত্রায় কী পরে আছেন, সেটিও প্রতিকুল অবস্থায় তার পরিণতি প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
উড়োজাহাজ নিরাপত্তা পেশাদারদের পরামর্শ সংক্ষেপে এইরকম — সুতি কাপড়ের লম্বা প্যান্ট পরুন। শর্টস, স্কার্ট বা ঢিলেঢালা পোশাক এড়িয়ে চলুন। জুতা হোক শক্ত ও ফিতাবাঁধা — হিল, স্যান্ডেল বা সহজে খুলে যায় এমন জুতা বিপদে বিপদ বাড়াতে পারে। হিল পরে থাকলে স্লাইড ব্যবহারের আগেই খুলে ফেলুন, কারণ হিল স্লাইড ছিদ্র করে দিতে পারে।
শেষ কথা
উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা বিরল, এবং আধুনিক ফ্লাইট চলাচলের নিরাপত্তার মান অত্যন্ত উচ্চ। কিন্তু যে বিরল মুহূর্তে জরুরি স্লাইড ব্যবহারের দরকার পড়ে, সেই মুহূর্তে আপনার পোশাকই হতে পারে প্রথম সুরক্ষা। একজোড়া সুতির লম্বা প্যান্ট — এটুকু প্রস্তুতিই যথেষ্ট।
পরের বার দীর্ঘ ফ্লাইটে শর্টস পরার পরিকল্পনা থাকলে আগে একবার ভাবুন।
সূত্র: মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ), স্কাইব্রেরি এভিয়েশন সেফটি, সিম্পল ফ্লায়িং, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস