এয়ারবাসের সঙ্গে বিমানের উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি ৭ অক্টোবর
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
| Published: Sunday, October 04, 2026
ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কিনতে আগামী ৭ অক্টোবর চুক্তি করতে যাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থাটি বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসের উড়োজাহাজ নিয়ে একটি মিশ্র বহর পরিচালনার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর রেডিসন হোটেলে এ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
প্রস্তাবিত প্যাকেজে রয়েছে চারটি এয়ারবাস A350-900 ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ এবং ছয়টি A321neo ন্যারোবডি উড়োজাহাজ। দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুট এবং আঞ্চলিক ও মধ্যপাল্লার রুট সম্প্রসারণে এসব উড়োজাহাজ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এর আগে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কিনবে এবং অক্টোবরেই এ বিষয়ে চুক্তি হতে পারে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “হ্যাঁ, আমরা এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কিনছি। ইনশাআল্লাহ, অক্টোবরে চুক্তি হবে।”
৭ অক্টোবর এ চুক্তির মধ্য দিয়ে কয়েক মাসের মূল্যায়ন ও আলোচনা শেষে এয়ারবাসের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রবেশ করবে। কিছুদিন আগেই বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমানের উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা বেড়ে ২৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
গড়ে উঠছে মিশ্র বহর
এয়ারবাসের সঙ্গে প্রস্তাবিত এই চুক্তি বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বহর পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। বর্তমানে বোয়িংনির্ভর বহরে এয়ারবাসের দুটি নতুন মডেল যুক্ত হবে।
চারটি A350-900 মূলত দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। দুই ইঞ্জিনের এই ওয়াইডবডি উড়োজাহাজের মাধ্যমে বিদ্যমান দীর্ঘপাল্লার রুটে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় নতুন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ছয়টি A321neo আঞ্চলিক ও মধ্যপাল্লার রুটে বিমানের সক্ষমতা বাড়াবে। এসব রুটে সবসময় ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ পরিচালনা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নাও হতে পারে। ফলে তুলনামূলক ছোট A321neo উড়োজাহাজ এসব রুটে বেশি কার্যকর হতে পারে।
দুটি মডেল মিলিয়ে দীর্ঘপাল্লা, আঞ্চলিক ও মধ্যপাল্লার রুটে বিমানের সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দ্রুত বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজারে নিজেদের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর সুযোগ পাবে বিমান।
বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, এয়ারবাসের উড়োজাহাজগুলোর সরবরাহ ২০৩৩ সালে শুরু হয়ে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সাল পর্যন্ত চলতে পারে। উড়োজাহাজ নির্মাণে দীর্ঘ অপেক্ষার সময় এবং কয়েক বছর আগেই উৎপাদন স্লট নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কারণেই এমন সময় লাগছে।
মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হবে না বিমানকে। মূলত উড়োজাহাজ সরবরাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা থাকবে।
দাম এখনো প্রকাশ হয়নি
এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবিত প্যাকেজের চূড়ান্ত বাণিজ্যিক মূল্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
উড়োজাহাজের দাম নির্ভর করে কেবিন বিন্যাস, ইঞ্জিন নির্বাচন, খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণ প্যাকেজ, অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্তের ওপর।
তাই চুক্তি স্বাক্ষরের পর চূড়ান্ত মূল্য, উড়োজাহাজ সরবরাহের বিস্তারিত সময়সূচি এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত নিয়ে আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বহর পরিকল্পনা মূল্যায়নের অংশ হিসেবে এয়ারবাসের প্রস্তাবটি বিবেচনা করা হয়। এ প্রস্তাবে চারটি A350-900 এবং ছয়টি A321neo সরবরাহের কথা রয়েছে।
পুরোনো উড়োজাহাজ প্রতিস্থাপন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক রুট নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়েছে।
পাইপলাইনে ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ
এয়ারবাসের প্রস্তাবিত ক্রয় এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণ কর্মসূচির দিকে এগোচ্ছে।
এর আগে বিমান প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি করে। ওই প্যাকেজে রয়েছে আটটি Boeing 787-10 Dreamliner, দুটি 787-9 Dreamliner এবং চারটি 737-8 উড়োজাহাজ।
পরবর্তীতে আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ—পাঁচটি 787-10 এবং ছয়টি 737-8—কেনার পরিকল্পনা যুক্ত হয়। ফলে বিমানের মোট বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫টিতে।
এখন এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সম্পন্ন হলে, বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বহর সম্প্রসারণের পাইপলাইনে বোয়িং ও এয়ারবাস মিলিয়ে মোট ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ থাকবে।
এর মধ্যে ১৯টি হবে ওয়াইডবডি এবং ১৬টি ন্যারোবডি উড়োজাহাজ। ফলে আগামী এক দশকে দীর্ঘপাল্লা, আঞ্চলিক ও মধ্যপাল্লার রুটে বিমানের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে নতুন উড়োজাহাজগুলোর অধিকাংশই পেতে কয়েকবছর সময় লাগবে। ফলে তাৎক্ষণিক ঘাটতি পূরণে আরও কিছু উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে বিমান।
বড় সম্প্রসারণ, বড় চ্যালেঞ্জও
এত বড় পরিসরে উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা বিমানের বহর ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।
অতীতে বিমান এয়ারবাসের উড়োজাহাজ পরিচালনা করলেও বর্তমানে সংস্থাটির জেট বহর মূলত বোয়িংনির্ভর। নতুন করে A350 ও A321neo যুক্ত হলে পাইলট, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, গ্রাউন্ড সাপোর্ট সরঞ্জাম এবং কারিগরি সহায়তার জন্য আলাদা প্রস্তুতি নিতে হবে।
মিশ্র বহর পরিচালনায় ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। তবে এর সুবিধাও রয়েছে। রুটের ধরন ও যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট মডেলের উড়োজাহাজ ব্যবহারের মাধ্যমে বিমান পরিচালনায় আরও বেশি নমনীয়তা আসতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিমানের ভবিষ্যৎ পরিচালন চাহিদা এবং টেকসই মিশ্র বহর গড়ে তোলার লক্ষ্য বিবেচনায় নিয়েই এই উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ দেশের বিমান চলাচল অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও এগিয়ে চলছে। ফলে ভবিষ্যতে দেশের এভিয়েশন খাতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
তবে বিমানের জন্য শুধু নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহ করাই বড় চ্যালেঞ্জ নয়। এসব অতিরিক্ত উড়োজাহাজের সক্ষমতা কাজে লাগাতে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নতুন রুট তৈরি, যাত্রীবাজারে অংশীদারিত্ব বাড়ানো, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং বহর সম্প্রসারণকে টেকসই মুনাফায় রূপ দেওয়াই হবে বড় পরীক্ষা।
তারপরও আগামী ৭ অক্টোবরের চুক্তি বিমানের বহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ কর্মসূচিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে যাচ্ছে। চুক্তিটি সম্পন্ন হলে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় পরিকল্পনায় বোয়িং ও এয়ারবাস মিলিয়ে ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হবে।