শাহজালালে ১২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, ১,০০০ চাকরির প্রস্তাব মেনজিসের
৩য় টার্মিনালে দ্বিতীয় হ্যান্ডলিং লাইসেন্স পেতে চেলেবি, ডনাটা, সুইসপোর্ট ও এসএটি-এর মুখোমুখি যুক্তরাজ্যের মেনজিস এভিয়েশন
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
| Published: Thursday, September 17, 2026
ছবি: ওহিদুজ্জামান টিটু
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনালে দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও যাত্রীসেবা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার দৌড়ে অন্যতম প্রতিযোগী হিসেবে রয়েছে যুক্তরাজ্যের বিমান চলাচল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘মেনজিস এভিয়েশন’।
এই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চুক্তি বা লাইসেন্স অর্জিত হলে কার্যক্রমের প্রথম বছরেই ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (১২ মিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগের বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে সরাসরি ১,০০০ জন বাংলাদেশি নাগরিকের উচ্চবেতনের চাকরি এবং পরোক্ষভাবে আরও সাড়ে ৪,০০০ জনের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তারা।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মেনজিসের মেনজিস এভিয়েশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এসব পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
মেনজিস এভিয়েশনের কর্মকর্তারা জানান, কেবল সরাসরি বিমানবন্দরে নিয়োগই নয়, তাদের আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও পরিচালন কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের তৈরি পোশাক খাত এবং স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও সাড়ে ৪,০০০টিরও বেশি পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা পরিচালনার দ্বিতীয় লাইসেন্স পাওয়ার জন্য দরপত্র প্রক্রিয়ায় মেনজিসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য এভিয়েশন প্রতিষ্ঠান, যেমন চেলেবি এভিয়েশন, ডানাটা, সুইসপোর্ট ও স্যাটস প্রতিযোগিতা করছে।
সংবাদ সম্মেলনে মেনজিস এভিয়েশনের মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া (এমইএএ) অঞ্চলের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস ওয়াইলি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের অপারেশনসের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জন হেন্ডারসন বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনের ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ডিরেক্টর সাকিব এরশাদও উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন।
ঢাকায় স্থাপিত হবে ‘মেনজিস ট্রেনিং একাডেমি’
মেনজিস জানিয়েছে, তাদের প্রস্তাবিত ১২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বড় একটি অংশ ব্যয় করা হবে বিমানবন্দর পরিচালন ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের স্থানীয় বিমান চলাচল খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে।
এর অংশ হিসেবে ঢাকার বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় একটি বিশ্বমানের ‘মেনজিস ট্রেনিং একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এই একাডেমিতে আন্তর্জাতিক মানের বিমান পরিচালন ও সেবা সংক্রান্ত বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যা বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এভিয়েশন খাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ করে দেবে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও এভিয়েশন স্কুলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে শিক্ষা কার্যক্রম, ইন্টার্নশিপ এবং গ্র্যাজুয়েটদের ক্যারিয়ার গড়ার সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি করার কথা জানিয়েছে মেনজিস।
কোম্পানিটির কর্মকর্তারা বলেন, এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে স্থানান্তরের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে পরিচালন, কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা আরও শক্তিশালী হবে।
স্থানীয়ভাবে তৈরি হবে পোশাক ও ইউনিফর্ম
মেনজিসের বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা কার্যক্রম ও স্থানীয় অপারেশনের জন্য নির্ধারিত ইউনিফর্ম বাংলাদেশ থেকেই তৈরি ও সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ব্যবসার পরিধি ও রফতানির সুযোগ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
কোম্পানিটি আরও জানায়, স্থানীয় নিয়োগ, পেশাগত প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞান হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশে একটি টেকসই এভিয়েশন কর্মীভিত্তি গড়ে তোলা তাদের মূল লক্ষ্য।
‘ভূরাজনৈতিক চাপ নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত’
দ্বিতীয় হ্যান্ডলার নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ভূরাজনৈতিক বা রাজনৈতিক বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রিটিশ হাইকমিশনের ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ডিরেক্টর সাকিব এরশাদ বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
তিনি বলেন, "মেনজিসের প্রস্তাবনা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আমরা এ বিষয়ে খুবই আত্মবিশ্বাসী। আমরা আশা করি ভূরাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে একটি নিরপেক্ষ ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে"। মেনজিস এভিয়েশন জানায়, বাংলাদেশে এই প্রস্তাবিত বিনিয়োগের মাধ্যমে দু দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।
তৃতীয় টার্মিনালে বাড়বে সেবার মান ও প্রতিযোগিতা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও পরিচালনাকারী কনসোর্টিয়ামের অধীনে দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগ দেওয়া হলে এ খাতের একচেটিয়া ব্যবস্থার অবসান ঘটে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।
এর ফলে এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালন খরচ যুক্তিসঙ্গত হওয়ার পাশাপাশি যাত্রীদের ব্যাগ পাওয়ার সময়সীমা কমে বিশ্বমানের যাত্রীসেবা নিশ্চিত হবে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালে পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।